জিয়া থেকে খালেদা অতঃপর – বীর মুক্তিযোদ্ধা লেফটেন্যান্ট কর্ণেল শরীফুল হক ডালিম

আমরা প্রায়ই ইতিহাস শব্দটিকে ব্যবহার করি। আমরা কি আদৌ ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করি? করিনা। যদি করতাম তাহলে আমাদের জীবনের উন্নতি হতো । উন্নতি অর্থ কি ? উন্নতি অর্থ হলো ক্রমাগত উপরে উঠা এবং উঠতেই থাকা। এই উপরে উঠার গতি মন্থর হতে পারে কিন্তু সাবলীল হতে হবে।  আমি “আমরা” শব্দটি ব্যবহার করছি। “আমরা” অর্থ যারা বাংলাদেশের নাগরিক তাঁরা। আমরা অর্থ বাংলাদেশীরা। গোটা বাংলাদেশী সমাজে যদি শতকরা পাঁচ জন সম্পদশালী হয় আর শতকরা ৯৫% যদি অনিশ্চিত জীবনযাপন করে তাহলে ঐ পাঁচজনই এই ৯৫ জনের অনিশ্চিত জীবনের জন্য দায়ী। শতকরা ৯৫ অর্থ কি ? দেশে যদি ১৭ কোটি মানুষ থাকে তাহলে শতকরা ৯৫ জন অর্থাৎ ১৬ কোটি ১ লাখ ৫০ হাজার মানুষ। এতগুলো মানুষ যদি ঐক্যবদ্ধ হয়ে ৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে তাহলে তাদের পিষে মারতে পারবে। কিন্তু কেন তা পারেনা?

পারেনা কারণ পারার দরকার মনে করেনা
ঐক্য নেই সেজন্য পারেনা
বাংলাদেশীরা মহা শঙ্কর তাই এরা যাকে দ্যাখে তাকেই নিজেদের অতীত বাপ মনে করে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে যায় সেবা দেবার জন্য। বাপের সেবাতে নিয়োজিত হয়ে যার যার আখের গোছাতে চায়। এইভাবেই একদিন শতকরা পাঁচ থেকে শতকরা সাত হয়। বাকীরা ভোগে। দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার।

প্রবাসনিউজ২৪ এ আমরা খন্ডিত আকারে একটি বই প্রকাশ করবো
বইটি লিখেছেন

বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল শরিফুল হক ডালিম

বীর উত্তম শব্দটি এখানে ব্যবহার করছিনা। এই পদবী তিনি পেয়েছিলেন ১৯৭১ সালের পরে । এখনকার মতই তখনও রাজ্য সরকার প্রতিষ্টা করার জন্য পাকিস্তান থেকে শেখ মুজিবকে বাংলাদেশে নিয়ে আসে ভারত। সেই সময় কোন বীর উত্তমই এর প্রতিবাদ করেনা। শেখ মুজিবকে সেদিন বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দিতে কোন মুক্তিযোদ্ধা বাঁধা প্রদান করেনি। শেখ মুজিব একজন রাস্ট্রদ্রোহী তবু তাকে দিয়েই পূর্ব বাংলাতে ভারতের রাজ্য সরকার প্রতিষ্টা করে ধ্বংস করা হয় বাংলাদেশের অর্থনীতি তথা কৃষি, শিল্প, সাংস্কৃতি, সভ্যতা ও ধর্মীয় পরিবেশ । হাজার হাজার বিরোধীদলের সদস্যসহ দশ লাখ সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হয়েছি ১৯৭২-৭৫ সালে। কমরেড সিরাজ সিকদার ছাড়া আর কোন মুক্তিযোদ্ধা বিদ্রোহ করেনি। সবাই চুপচাপ বীর উত্তম খেতাব ঝুলিয়ে বসেছিল।

সেদিন কি একবারও কারু আগরতলা মামলার কথা মনে আসেনি
একবারও মনে আসেনি স্বেচ্ছাই কেন শেখ মুজিব রক্তাক্ত নয় মাস পাকিস্তানে পালিয়ে ছিল? যে কাপুরুষের মত বন্দুকের নলের মুখে সাড়ে সাত কোটি বাংলাদেশীকে ফেলে নিজের জীবন বাঁচাতে পারে সে বিদেশীদের হাত ধরে যখন দেশে ফিরে আসে তখন তো তাকেই পুজা করবে যারা তার প্রান ভিক্ষা দিয়েছে, তাইনা?

খুব স্বাভাবিক ঘটনা। আমি লিখবোনা বীর উত্তম শব্দটি।
আয়শা মেহের
সম্পাদিকা
প্রবাসনিউজ২৪
টরেন্টো, কানাডা

আসুন পাঠ করি ০০০০

জিয়া থেকে খালেদা অতঃপর – প্রথম পর্ব 

“জিয়া থেকে খালেদা তারপর”
লেখকের কথা
আমার লেখা এই বইটিতে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠআত্মপরিচিতি, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, পাকিস্তান আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন, স্বাধীনতার সশস্ত্র সংগ্রাম, স্বাধীনতা উত্তরকালে আওয়ামী-বাকশালি একদলীয় স্বৈরশাসনের পতনের লক্ষে ১৫ই আগস্ট বিপ্লব, ২-৩রা নভেম্বর খালেদ-চক্রের প্রতিক্রিয়াশীল ব্যর্থ ক্যু’দেতা এবং ৭ই নভেম্বরের মহান সিপাহী-জনতার বিপ্লব, জেনারেল জিয়া, জেনারেল এরশাদ এবং বেগম খালেদা জিয়ার শাসনকালে সেনা পরিষদের অবদান পরবর্তী পর্যায় বাংলাদেশের রাজনীতি সম্পর্কে বস্তুনিষ্ঠ ঘটনাবলি লেখার চেষ্টা করলাম ব্যক্তিগত এবং সহযোদ্ধাদের অভিজ্ঞতার আলোকে, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, ইতিহাস গবেষক এবং বোদ্ধাজনদের বিচার-বিশ্লেষণের সুবিধার্থে। আমার লেখা ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত ‘‘যা দেখেছি যা বুঝেছি যা করেছি’’ বইটির ধারাবাহিকতাতে লেখা “জিয়া থেকে খালেদা অতঃপর”। তাই লেখার সারবস্তুর সঠিক উপলব্ধি এবং বিচার বিশ্লেষণের জন্য বইটি পাঠকদের পড়াটা জরুরী। যারা বইটি সংগ্রহ করতে অপারগ তারা
www.majordalimbubangla.com

কিংবা

www.majordalimbu.com

থেকে বইটি ডাউনলোড করে নিতে পারবেন প্রকাশকের অনুমতি সাপেক্ষে।
বইটি লেখার মূল উদ্দেশ্য হল দেশবাসী বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম যাতে তথ্যভিত্তিক উপাদানগুলো থেকে সত্যকে খুঁজে নিতে পারেন। চিনে নিতে পারেন বিগত চার দশকের উপর সময়কাল ধরে যারা ক্ষমতার নাগরদোলায় পালাবদলের জাতীয় স্বার্থবিরোধী সমঝোতার রাজনীতি নিজেদের হাতে কুক্ষিগত রেখে জনগণকে দ্বিধাবিভক্ত করে অপার সম্ভাবনার দেশটাকে অনিশ্চিত অন্ধকারে ঠেলে দিয়ে নিজেদের স্বকীয়তা এবং অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন করে তুলেছেন তাদের আসল চেহারাটা। ঠিকভাবে অতীত ইতিহাসের আলোকে নেতা-নেত্রীদের চরিত্র না জানলে বর্তমান ও ভবিষ্যতে কোনও জাতি কখনোই সঠিক নেতৃত্ব এবং পথের সন্ধান খুঁজে পেতে পারে না।

বাংলাদেশ

আমাদের এই ভূখণ্ড বা দেশের উৎপত্তি হয়েছে মূলত গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, মেঘনা এবং এদের হাজারও শাখা-প্রশাখা বাহিত পলিমাটি দ্বারা। আদিবঙ্গের জন্ম দিয়ে ঐ সমস্ত স্রোতস্বিনী বিলীন হয়েছে বঙ্গোপসাগরে।
পলিমাটি দ্বারা সৃষ্টি এই ভূখণ্ডের প্রাচীন ঐতিহাসিক নাম ছিল বঙ্গদেশ বা বাংলাদেশ। ‘বঙ্গ’ শব্দের আভিধানিক মানে হচ্ছে সঙ্কর ধাতু দিয়ে জোড়া লাগানোর দেশ।
এ থেকেই ধারণা করা যায়, প্রাচীন সমসাময়িক সভ্যতার কাতারে বঙ্গদেশের স্থান ছিল শীর্ষ পর্যায়ে। কারণ, খনিজ ধাতব পদার্থ যেমন সোনা, লোহা, তামা, কাঁসা, টিন ইত্যাদি সম্পর্কে প্রাযুক্তিক জ্ঞান ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে ধাতুর ব্যবহারের মাত্রা আজও গণ্য করা হয় সভ্যতার মানদণ্ড হিসাবে।
বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর আদিবাসভূমি বঙ্গদেশের রয়েছে একটি ঐতিহাসিক সীমানা।
উত্তরে হিমালয়ের গা ঘেঁষে নেপাল, ভুটান, সিকিম, উত্তরপূর্বে আসাম, মণিপুর, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, ত্রিপুরা, অরুণাচল, মেঘালয়, উত্তর-পশ্চিম দিকে দ্বারভাঙ্গা পর্যন্ত ভাগীরথীর অববাহিকার সমতল এবং রাঢ়ভূমি-রাজমহল, সাঁওতাল পরগণা, ছোটনাগপুর, মুর্শিদাবাদ, মালদহ, পশ্চিমবঙ্গের পুরোটাই, বিহারের বীরভূম, মানভূম, কেওঞ্জর, ময়ুরভঞ্জের অরণ্যময় মালভূমি, অঙ্গ, বর্তমানের মিথিলা ও কলিঙ্গ উড়িষ্যার অংশ হিসাবে বাংলাদেশের তথা আদিবঙ্গদেশের অন্তর্ভুক্ত ছিল। পূর্বে মিয়ানমার আর শ্যামদেশ ঘেঁষে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। এই সুবিশাল আদিবঙ্গ বা বাংলাদেশের সীমানার মধ্যেই গৌড়, পুণ্ড্র, বরেন্দ্র, রাঢ়, সুহ্ম, তাম্রলিপ্ত, সমতট, অঙ্গ, বাঙ্গাল, হরিকেল নামের ঐতিহ্যময় জনপদ গড়ে তুলেছিল বঙ্গবাসী বা বাংলাদেশীরা। কোল, ভীল, শবর, পুলিন্দ, হাড়ী, ডোম, চণ্ডাল, সাঁওতাল, মুণ্ডা, ওঁরাও, ভূমিজ, বাগদী, বাউরি, পোদ, মালপাহাড়ি প্রমুখ অন্ত্যজ জনগোষ্ঠীর মিলন এবং তাদের সাথে বহিরাগত নানা রক্তের ধারা মিশে এক হয়ে গড়ে উঠে বঙ্গবাসী কিংবা বাংলাদেশী জাতিসত্তার।

কালের স্রোতে বহিরাগত আগ্রাসী শক্তিদের দ্বারা বাংলাদেশীদের আবাসভূমি খণ্ডিত হলেও ঐতিহাসিক সীমানা একদিন অবশ্যই পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে প্রাকৃতিক নিয়মেই। রাষ্ট্রীয় সীমানা অনিবার্যভাবে অতীতের মতো পরিবর্তনশীল থাকবে আগামীতেও।
আমাদের পূর্বপুরুষরা প্রাচীনকালে গড়ে তুলেছিলেন প্রসিদ্ধ জনপদগুলো। সভ্যতার বিকাশ ঘটিয়েছেন, জন্ম দিয়েছিলেন বিস্ময়কর সংস্কৃতি ও শিল্প ঐতিহ্যের। এই ঐতিহ্য আমাদের জাতীয় অধিকার।
আজ রাষ্ট্রীয় সীমানা এবং জাতীয়তাবাদ নিয়ে গোষ্ঠীস্বার্থে অযথা যতই বিতর্কের অবতারণা করা হোক না কেনও, বাংলাদেশের সচেতন জনগণকে বোকা বানিয়ে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করা সম্ভব হবে না চিরকাল। তারা তাদের অতীত ঐতিহ্য এবং ন্যায্য অধিকার সময় মতো আদায় করে ছাড়বেই যোগ্য উত্তরসুরি হিসাবে ইন শা আল্লাহ্‌।
সমাজ বিজ্ঞানী এবং বিপ্লবী মাও সে তুং বলেছেন,
‘বিজাতীয়দের স্বার্থে যেসমস্ত জাতিসত্তা এবং তাদের রাষ্ট্রীয় সীমানা বিভিক্ত করা হয়েছে ছলে বলে কৌশলে, তারা একদিন আবার একত্রিত হবে এবং পুনরুদ্ধার করবে তাদের হারানো ভূখন্ড।’
এই বাস্তবতায় লেখকের বিশ্বাস, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অতীত ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার কোরে পূর্ণমর্যাদায় একদিন প্রতিষ্ঠিত করবে প্রকৃত বাংলাদেশ এবং সারা দুনিয়াতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম হবে গর্বিত বাংলাদেশী হিসাবে। উদীয়মান সূর্য ক্রমশ পূর্ণতায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে আর তারই আলোকে স্বচ্ছ শতাব্দীকালের ধারায় গঠিত প্রকৃত বাংলাদেশ। এটা লেখকের কাল্পনিক দিবাস্বপ্ন নয়। ইতিহাসের অমোঘ নিয়মেই ভবিষ্যতে একদিন এই স্বপ্ন রূপান্তরিত হবে বাস্তব সত্যে।
আমাদের এই দেশের নাম বঙ্গদেশ বা বাংলাদেশ। প্রশ্ন দেখা দেয় ‘বাংলা’ অথবা ‘বাঙ্গালা’ এবং ‘বাঙ্গালী’ শব্দের উৎপত্তি হল কি করে?
ঐতিহাসিক পটভূমিকায় আবুল ফজল ‘আইন-ই-আকবরী’ গ্রন্থে বাংলা বাঙ্গালা, বাঙ্গালী শব্দের যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন সেটা হল- প্রাচীন বঙ্গ শব্দের সাথে ‘আল’ শব্দ যুক্ত কোরে সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ্‌ বাংলা শব্দের চয়ন করেন। আল শব্দের অর্থ পানি রোধ করার ছোট বড় বাঁধ। অন্যদিকে, সুকুমার সেনের অভিমত হল- প্রথমে বঙ্গ থেকে বাঙ্গালাহ শব্দের সৃষ্টি হয়েছে মুসলিম শাসন আমলে। পারসিক শব্দ বাঙ্গালাহকে পর্তুগীজ দস্যুরা বানিয়েছে বেঙ্গল আর বঙ্গবাসীদের নামকরণ হয় বেঙ্গলী। ইংরেজরা এই পরিভাষাকেই বহাল রাখে তল্পিবাহক চাণক্যদের অনুরোধে।
বর্তমান বাংলাদেশে এখনও জাতীয়তাবাদ প্রসঙ্গে বিভ্রান্তি পরিলক্ষিত হয়। সমাজের শক্তিধর গোষ্ঠী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, এবং রাজনীতিবিদরা এই বিভ্রান্তিকে আরও জটিল করে তুলেছেন ক্ষণস্থায়ী ফায়দা লোটার জন্য। এই বিভাজনকারী বিভ্রান্তি নিরসনের জন্য বুদ্ধিজীবীদের যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার প্রয়োজন তাও প্রায় অনুপস্থিত। জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনে পরিষ্কার ভাবে সত্যকে আমাদের জানতে হবে, আমাদের জাতীয়তাবাদ কি? ‘বাংলাদেশী’ না ‘বাঙালী’!
আদিবঙ্গ অববাহিকা ও তদসংলগ্ন অঞ্চল যে দক্ষিণএশিয়া উপমহাদেশে প্রাচীন কালে সুপরিচিত, স্ব-বৈশিষ্টে সমুজ্জ্বল একটি উন্নত বিত্তশালী অঞ্চল হিসাবে পরিগণিত হতো তার অসংখ্য সাক্ষ্য-প্রমাণ প্রাচীন বৈদিক সাহিত্যে বর্ণিত রয়েছে।
খ্রিস্টপূর্ব ১৪০০-১০০০ সালের মধ্যে ঐতরেয় আরণ্যকে বঙ্গের কথা রয়েছে। মহাভারত ও হরিবংশেও দেখা যায় বঙ্গ প্রসঙ্গ। সুতরাং বাংলাদেশী জনগণকে অর্বাচীন বলে আখ্যায়িত করার কোনও উপায় নেই। রামায়ণেও বঙ্গের উল্লেখ আছে। এদেশের সর্বত্র ক্ষৌম কাপাশিক বস্ত্রশিল্পের জন্য প্রসিদ্ধ ছিল বলেও কৌটিল্য বয়ান করেছেন। বরাহ মিহির (৫০০-৫৪৩) খ্রিস্টাব্দে তার ‘বৃহৎ সংহিতা’ গ্রন্থে পূর্বাঞ্চলীয় দেশকে বঙ্গ বলে অবহিত করেছেন। সতীশচন্দ্র মিত্র যশোর, খুলনা, সংলগ্ন দক্ষিণবঙ্গের কিছু অংশকে উপবঙ্গ রূপে সনাক্ত করার প্রয়াস পান।

হিমযুগের পর থেকে বাংলাদেশ কখনও জনশূন্য থাকেনি। পৃথিবীর অন্যান্য মানব সভ্যতার মতো বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীরও বিবর্তন ঘটেছিল। কারণ, এখানেও প্রত্ন প্রস্তর এবং তাম্র যুগের অস্ত্র সম্ভার ও মুদ্রা পাওয়া গেছে। ভাষার ও আকৃতির ঐক্য হতে সিদ্ধান্ত নেয়া যায় বাংলাদেশের আদিম জনগোষ্ঠী একটি বিশেষ মানবগোষ্ঠীর বংশধর। এই মানবগোষ্ঠীর সাথে অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের চেহারা, গড়ন এবং ভাষার মিল পাওয়া যায় বলেই এদের বলা হয় অস্ট্রো-এশিয়াটিক অথবা অস্ট্রিক।
বাংলাদেশের দোরগোড়ায় রাজমহল পাহাড়, সেখানের বনজঙ্গলে বসবাসকারী পাহাড়িদের ছোটো-খাটো গড়ন, চেহারা, গায়ের রং কালো, নাক থ্যাবড়া। বেদ ও নিষাদে যে বর্ণনা আছে তাতে বঙ্গবাসীদের সাথে সিংহলের ভেড্ডাদের হুবহু মিল রয়েছে তাই, এদের নৃতাত্ত্বিক নামকরণ হয় ভেড্ডীড। নিষাদজাতি বলেও এই দুই জনগোষ্ঠীকে আখ্যায়িত করা হয়েছে। প্রাচীন বাংলাদেশে নানা পরিবেশে এবং জল হাওয়ায় দলগতভাবে মানুষ বসবাস কোরত। পরে তাদের রক্তে বহিরাগতদের রক্তের ধারা এসে মিশেছে পর্যটন ও ব্যবসায়িক সূত্রে। বাঁচবার আলাদা আলাদা প্রক্রিয়া এবং ভিনদেশী রক্তের মেলামেশার দরুন স্থানভেদে চেহারায় বৈচিত্র্য পরিলক্ষিত হয়। মননশীলতায়, ভাষায়, সভ্যতার বাস্তব উপাদানে তার প্রচুর ছাপও রয়েছে। বাংলাদেশের মাটি আর সেই মাটিতে নানা নৃতাত্ত্বিক জাতের মিশ্রণের ফলেই বাংলাদেশের জনপ্রকৃতির মাঝে ঐক্যের শেকড় দৃঢ়ভাবে প্রোথিত হয়ে আছে।
বাংলাদেশের আদিম অধিবাসীগণের বহিরাগত আর্যদের সাথে কোনও সংশ্রব ছিল না। বাংলা ভাষার বিশ্লেষণ কোরে পণ্ডিতগণ এই সিদ্ধান্তেই উপনীত হয়েছেন। উপরন্তু, আর্য কিংবা দ্রাবিড় আসলে নরগোষ্ঠীর নাম নয়, ভাষাগোষ্ঠীর নাম মাত্র।
একই নরগোষ্ঠীর মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন ভাষার চলন থাকতে পারে। কাজেই শুধুমাত্র ভাষা দিয়ে কোনও নরগোষ্ঠীর জাতীয় পরিচয় নির্ধারণ যুক্তিগত কারণেই সঠিক নয়। শুধুমাত্র একটি উপাদানের উপর ভিত্তি করে কোনও জাতিসত্তার বিকাশ সম্ভব নয়। জাতীয়তাবাদ গঠনে মূলত ভূখণ্ড, ভাষা, নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ বিশেষ ভূমিকা রাখে। যেকোনো ভূখণ্ডে ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায়, জাত, কুল, নির্বিশেষে যখন কোন জনগোষ্ঠী এক সামগ্রিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠে তখনই জাতীয়তাবাদ প্রাণ পায়। জাতীয়তাবাদ মূলত এক ধরনের অনুভূতি, এক ধরনের আবেগ তাড়িত মানসিকতা, এক ধরনের একাত্মবোধ ও চেতনা যা সৃষ্টি হয় প্রবহমান জীবনধারায়। জাতীয় সংগ্রামের ধারায় গতিশীলতা অর্জন করার জন্য কখন কোন উপাদানটি বিশেষ ভূমিকা রাখবে সেটা নির্ভর করে সময়, বাস্তব পরিস্থিতি, সংগ্রামের লক্ষ, জনগণের প্রত্যাশা এবং নেতাদের সিদ্ধান্তের উপর।
অতীত সম্পর্কে গৌরববোধ, বর্তমানের সুখ কিংবা বঞ্চনা আর ভবিষ্যতের রঙিন স্বপ্ন জাতীয়তাবাদের চেতনা জাগ্রত করে এবং জনমনে গড়ে তোলে ঐক্যবদ্ধ মূর্ছনা। এ ধরনের ঐক্যবদ্ধ চেতনা যখন সাধারণ জনগণকে একত্রিত করে তখন সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে তা হয়ে ওঠে অপ্রতিরোধ্য। সামাজিক সত্তা হিসাবে সেটা বিভিন্ন মাত্রায় প্রকাশিত হলেই একটি জাতি সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য নৈতিকভাবে প্রস্তুত হয়।
বাংলাদেশীদের জাতীয়তাবাদী সংগ্রামের এক পর্যায়ে ভাষা মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে এ কথা সত্যি, তাই বলে বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদকে বাঙালী জাতীয়তাবাদ বলে আখ্যায়িত করলে সেটা হবে বিভিন্ন নরগোষ্ঠীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় হাজার বছরের ঐতিহ্যে গড়ে ওঠা বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের উপর একটি ভাষাগোষ্ঠীর আধিপত্য চাপিয়ে দেয়া। কারণ, বাংলাভাষীর সমার্থক বাঙ্গালী শব্দটি কোনও নরগোষ্ঠীর জাতিগত পরিচিতি নয়, ভাষাগোষ্ঠীর পরিচিতি মাত্র।

 

সূচীপত্র  [প্রতিটি পর্বে্র নীচে ক্লিক করলেই সেই পর্বটি পাঠ করতে পারবেন]

১ম পর্ব   “জিয়া থেকে খালেদা অতঃপর” – লেখকের কথা

২য় পর্ব  শ্রদ্ধেয় মওলানা ভাসানীর সাথে শেষ সাক্ষাত

৩য় পর্ব দ্বিজাতি তত্ত্ব

৪র্থ পর্ব –  কিছু বিভ্রান্তি এবং অপপ্রচারের জবাব

৫ম পর্ব – সত্য কহন

৬ষ্ঠ পর্ব – ব্যাংককে আমরা

৭ম পর্ব – বঙ্গভবনে কি হচ্ছিল রাত ১২ টায়!

৮ম পর্ব – বন্দীত্ব থেকে মুক্ত করা হলো জেনারেল জিয়াকে

৯বম পর্ব – “সংঘর্ষের পথে জিয়া”

১০ম পর্ব – খন্দকার মোশতাকের বিশেষ দূত হিসেবে এলেন সাদ্রে ইস্পাহানী

১১তম পর্ব – শিশু ভাই এলেন ব্যাংককে

১২তম পর্ব  – নিজেদের আলোচনা

১৩তম পর্ব  ১ম কিস্তি   – রাষ্ট্রীয় অতিথি হয়ে লিবিয়ার পথে

১৩তম পর্ব – ২য় কিস্তি- রাষ্ট্রীয় অতিথি হয়ে লিবিয়ার পথে

১৪তম পর্ব –  বাংলাদেশ দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স জমির এলেন সস্ত্রীক

১৫তম পর্ব – এভিএম তোয়াব আসছেন

১৬তম পর্ব  –  শিশুভাইকে বেনগাজীতে আসার অনুরোধ

১৭তম পর্ব  –  ১ম কিস্তি – জিয়ার ডাকে ঢাকার পথে

১৭তম পর্ব – ২য় কিস্তি

১৭তম পর্ব –  ৩য় কিস্তি

১৭তম পর্ব –  শেষ কিস্তি

১৮তম পর্ব –  বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর ইতিহাস

১৯তম পর্ব –  জেনারেল মনজুরের সাথে বৈঠক

২০তম পর্ব – লন্ডন হয়ে ফিরলাম বেনগাজীতে

২১তম পর্ব – ঢাকা হোয়ে পিকিং-এর উদ্দেশ্যে যাত্রা

২২তম পর্ব – বাংলাদেশে নীতি বিবর্জিত কুটুম্বিতার রাজনীতির রূপ

২৩তম পর্ব –  জিয়ার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে

২৪তম পর্ব –  রাষ্ট্রপতি হিসাবে জিয়ার গণচীনে দ্বিতীয় সফর

২৫তম পর্ব  –  আব্বার উপস্থিতিতে প্রথম রাতে জেনারেল জিয়ার সাথে আমার বৈঠক

২৬তম পর্ব – দ্বিতীয় বৈঠক

২৭তম পর্ব – জিয়ার নিযুক্ত সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদের চীন সফর

২৮তম পর্ব – চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানিয়ে আসার পর রাষ্ট্রপতি জিয়ার প্রতিক্রিয়া

২৯তম পর্ব  –  চীন থেকে লন্ডনে নির্বাসন কালে

৩০তম পর্ব  –  জেনারেল মঞ্জুরের ব্যর্থ অভ্যুত্থান, জেনারেল এরশাদের ক্ষমতা দখল

৩১তম পর্ব  – নিউইয়র্কের পথে জেনারেল এরশাদের সাথে লন্ডনে সাক্ষাৎ

৩২তম পর্ব – খালেদা জিয়া হলেন বিএনপির চেয়ার পার্সন

৩৩তম পর্ব – জেনারেল এরশাদের প্ররোচনায় রশিদ-ফারুক বানালো ফ্রিডম পার্টি

৩৪তম পর্ব – ১ম কিস্তি – এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের ক্রান্তিকালে খালেদা জিয়ার পাশে সেনা পরিষদ

৩৪তম পর্ব – এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের ক্রান্তিকালে খালেদা জিয়ার পাশে সেনা পরিষদ

৩৪তম পর্ব – এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের ক্রান্তিকালে খালেদা জিয়ার পাশে সেনা পরিষদ-শেষ কিস্তি

৩৫তম পর্ব – ১৯৯১-এর নির্বাচনে খালেদা জিয়ার বিজয়ে সেনা পরিষদের অবদান – ১ম কিস্তি

৩৬তম পর্ব – ১৯৯১-এর নির্বাচনে খালেদা জিয়ার বিজয়ে সেনা পরিষদের অবদান  – শেষ কিস্তি পেশাওয়ারের পথে

৩৭তম পর্ব – ফিরে এলাম নাইরোবিতে

৩৮তম পর্ব – নব নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ডাকে ঢাকার পথে যাত্রা 

৩৯তম পর্ব – ঢাকায় পৌঁছালাম

৪০তম পর্ব –  ১ম কিস্তি – প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে খালেদা জিয়ার সরকারের পাশে সেনা পরিষদ

৪০তম পর্ব – প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে খালেদা জিয়ার সরকারের পাশে সেনা পরিষদ – ২য় কিস্তি

৪০তম পর্ব – প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে খালেদা জিয়ার সরকারের পাশে সেনা পরিষদ- শেষ কিস্তি

৪১তম পর্ব – রুহানী জগতের আর এক সূফি সাধকের সান্নিধ্যে

৪২তম পর্ব – আমাকে আবার খালেদা জিয়ার জরুরী তলব

৪৩তম পর্ব – ব্যাংকক ট্রানজিট লাউঞ্জে

৪৪তম পর্ব – হংকং হয়ে বেইজিং – ১ম কিস্তি

৪৪তম পর্ব –  হংকং হয়ে বেইজিং – শেষ কিস্তি

৪৫তম পর্ব – হংকং হয়ে ফিরলাম ঢাকায়

৪৬তম পর্ব – গোপনে আমেরিকা সফর

৪৭তম পর্ব – আবার ঢাকায়

৪৮তম পর্ব – নাইরোবিতে প্রত্যাবর্তন

৪৯তম পর্ব – দেশে ফিরলাম

৫০তম পর্ব – নিরুদ্দেশে যাত্রা

৫১তম পর্ব – ২৮শে জানুয়ারি ২০১০ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের নৃশংস হত্যাযজ্ঞ

৫২তম পর্ব – দেশের সূর্যসন্তান বীরদের ফাঁসিতে বিএনপি এবং জামায়াতের
প্রতিক্রিয়া

৫২তম পর্ব -দেশের সূর্যসন্তান বীরদের ফাঁসিতে বিএনপি এবং জামায়েতের
প্রতিক্রিয়া  –  শেষ কিস্তি

৫৩তম পর্ব – বিশ্বায়নের মোজেজা, রাষ্ট্র ও ধর্ম – ১ম কিস্তি

৫৩তম পর্ব – বিশ্বায়নের মোজেজা, রাষ্ট্র ও ধর্ম – শেষ কিস্তি

৫৪ তম পর্ব – শেষকথা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.