আমরা যখন কারু ভাল চাই তখন এক মুহুর্তের জন্যও ভাবিনা আগামীকাল জানবো এই মানুষটা যার ভাল করার জন্য ভাবছি, নিজের ক্ষতি করছি, সময়, শক্তি, অর্থের ব্যপক অপচয় করছি, যার ভালর জন্য নিজে ঝুঁকি নিচ্ছি সেই মানুষটা যখন এই ভাল চাওয়ার সুফল পাবে যখন সে নিজে ভাল থাকবে তখন আমি এই ঝুঁকি নেবার জন্য একাকী ভুগবো, একাকী ক্ষতি বহন করবো আর এই মানুষটা আমার সেই ভাল চাওয়া, সেই সহযোগীতার কথা সম্পুর্ন অস্বীকার করে, তার জন্য করা ঋন তো পরিশোধ করবেনা উলটো আমাকে একজন সেক্স অবজেক্ট হিসাবে অথবা পাগল হিসাবে অথবা বাজে একজন মহিলা হিসাবে সবাইকে বলবে এবং তুচ্ছ তাছিল্য করবে।
যদি শব্দটা খুব অসহায়।
যদি জানতাম
যদি বুঝতাম
যদি করতাম
যদি সাবধান হতাম
এখন যদি অমুক হয়
তখন যদি অমুক করতাম
যদির কথা নদীতে ফেলে দিলাম।
আমি অনেক মেধাবী মানুষের কথা পড়েছি যারা সুযোগের অভাবে তাদের লক্ষ্যে পৌছুতে পারেননি। আমি নিজেও একজন মেধাবী মানুষ যাকে পেটের দায়ে শিল্পী থেকে হিসাবরক্ষক হতে হয়েছে। সংসারের দায়িত্ব সামলাতে যেয়ে নিজের শখের পেছনে ছুটতে পারিনি। সেজন্য আমার কোন দুঃখ নেই। এসব নিয়ে ভাবিনা। যা হয়নি তা হয়নি। যা হতে পারে তাও হতে পারবেনা কারণ অন্য মানুষের স্বপ্ন পূরণ করতে যেয়ে আমি নিজেকে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করেছি। ফলে আমার আগামীকালের জন্য আমি নিজেই খুঁড়ে রেখেছি ভয়ংকর কষ্টের গর্ত।
আমার আগামীকাল শুধু ভোগান্তির সময়। শুধু পরিশ্রমের সময় আর পরিশ্রমের ফসল অন্যের জন্য করা ঋন পরিশোধের দুর্ভোগ পোহানো। নিজের হাত শূন্য থেকেই যাবে আগামীকাল।
২০১৫ সালের শেষের দিকে বাসা থেকে বেশ দুরের একটা অফিসে কাজ নিই আমি । বাসে করে সেখানে যেতে লাগতো প্রায় দেড় দুই ঘন্টা। তখন আমি দুই গেগাবাইট ডাটা প্লান নিলাম বাসে বসে বোর হবার চাইতে গান শুনবো অথবা লিখবো অথবা পড়বো কিন্ত এসব কিছু না করে ফেসবুকে এসেই প্রতিদিন আটকে যেতাম। একবার শরীফ খান নামের আমার এক ফেসবুক বন্ধু আমাকে তার দেওয়ালে যেয়ে তার কবিতার নীচে মন্তব্য করার জন্য বলে। আমি গেলাম । কবিতাটা বেশ ভাল লাগলো। তখন আমি সেই কবিতার নীচে কবিতা লিখে তারপর ভুলে গেলাম শরীফ খানের কথা।
তারপর আবার শরীফ খানের অনুরোধ পেলাম।
এবারের কবিতাটা আরো ভাল লাগলো
এর পরে শরীফ খানের দুই লাইনের গানের অডিও ক্লিপ পেলাম
আমার প্রিয় শ্রীকান্তের গান।
দেখো জোছনা ভেজা এই রাত
আমি উত্তরে লিখলাম – বাহ ! তোমার কন্ঠস্বর তো খুব সুন্দর। খুব ভাল আবৃতি করো, খুব ভাল গান করো, খুব ভাল কবিতা লেখো। তুমি গানের এলবাম বের করো আমি সাথে আছি। ফটো উঠানের হাতও ভাল তোমার। আমরা দুইজনে মিলে মুভি করবো একটা। আমি স্ক্রিপ্ট লিখবো তুমি ক্যামেরাতে থাকবে । খুব কম বাজেটের মুভি হবে। দুই ঘণ্টা বাসে বসে আমি এইসব লিখতাম শরীফ খানকে।
তারপর অফিসে ঢুকে ভুলে যেতাম আমার আগামীর মুভি প্রজেক্টের কথা। এই অফিসটা ছিল গুডলাইফের সুতারাং আমার সব চাইতে প্রিয় জীম এর সদস্য হয়ে নিয়মিত ব্যায়াম করতাম। লাঞ্চের সময় ব্যায়াম করতে যেতাম। আমি যে ফ্লাটে থাকি সেখানেওঁ জীম আছে, সুইমিং পুল আছে। আমি নিয়মিত সেখানেও যেতাম। আমি সাতার ভালবাসি । জীম ভালবাসি। হাটতে ভালবাসি। বেড়াতে ভালবাসি। ভ্রমন ভালবাসি। । লিখতে ভালবাসি। হাসতেও ভালবাসি। সবকিছুকে সহজভাবে নিই। সহজেই বিশ্বাস করি। দূরের বা কাছের সবাইকে সাধ্যমত সাহায্য সহযোগীতা করতে চেষ্টা করি। অর্থ দিয়ে না হলে বুদ্ধি দিয়ে। প্রেরনা দিয়ে। হাসি দিয়ে অথবা দুষ্টামি করে। হিউমার দিয়ে।
বাসে যেতে যেতে আমি শরীফ খানকে আমার ছেলেবেলার কথা লিখতাম। আমার বাবার কথা, মায়ের কথা ভাইবোনদের কথা। সাতারের কথা। জীমের কথা। বিয়ের কথা । তালাকের কথা।তারপর যখন আমার প্রাক্তন স্বামী কানাডা থেকে ঢাকাতে যায় তখন আমি তাকে শরীফ খানের সাথে দেখা করতে বলি। সে শরীফ খানের সাথে দেখা করে এবং আমার কাছে শরীফ খান সম্পর্কে প্রসংশা করে।
এর আগে শরীফ খান আমাকে বলে যে সে একটি ম্যাকবুক কিনতে চায় । সে বলে আইটি সোর্স নামে সাভার সিটি সেন্টারে তার দোকান আছে। যেখানে সে কম্পিউটার এবং কম্পুউটারের এক্সেসরিজ বিক্রি করে। শরীফ খান জানায় যে বাসাতে তার মা, ভাই এবং বোন থাকে। তাদের সে খুব ভালবাসে আর ওরাও তাকে খুব ভালবাসে।
শরীফ খান জানায় তার দোকানে সে প্রডাক্ট উঠাতে পারেনা পুঁজির অভাবে। বাজারে অনেক পাওনাদার, বাসাভাড়া বাকী থাকে, দোকানের ইলেক্ট্রিক বিল বাকী থাকে। পাওনাদারেরা ফোন করে খারাপ ব্যবহার করে তখন ওর মন খারাপ হয় যায়। মন খারাপ হলে তখন আর তাকে দিয়ে কোন কাজ হয়না। সাভারের সিটি সেন্টারের আইটি সোর্সে শরীফ খান তেমন যায়না। সেখানে রেদোয়ান নামের এক ভদ্রলোক বসেন। তাকে বেতন দেওয়া লাগেনা। তিনি নাকি বলেছেন তিনি সেই দোকানে বসতে পেরেই খুশী। বহুদিন বিদেশে ছিলেন। অনেক টাকা অনেক ব্যাঙ্ক বালান্স উনার। একদিন ভিডিও কলে আমি রেদোয়ান সাহেবের সাথেও কথা বলি। উনি কথার মাঝে মাঝে ইংরেজী বলেন। আমি বলিনা। কানাডাতে অফিসে কেউ বাংলা বলেনা। কানাডার দুইটা ভাষা। ইংরেজী আর ফ্রেঞ্চ। আমি কোনভাবে কিছুটা ইংরেজী বলতে পারি। যখন বাংলাদেশীদের সাথে কথা বলি তখন আমি ইংরেজী বলিনা। কারণ দুইটা। এক – আমি ইংরেজী পারিনা। দুই – বাংলাদেশিরা বাংলাতে কথা বললে বুঝবে আমি কি বলছি।
হয়তো এই ধারণাও ভুল। আমার বাংলা কোন বাংলাদেশীই বুঝনি কখনো। আমার ভাষা কেউ বুঝেনা। বাংলা বলি বা ইংরেজী। উর্দু বলি বা হিন্দী – আমার ভাষা কেউ বুঝেনা। আমার মনে হয়, কেউ কারু ভাষা বুঝেনা আর এই না বুঝার কারনেই জগতে এত জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে বা হয়ে থাকে।
যাইহোক শরীফ খান যখন ম্যাকবুক কিনবে বলেছে তার গান রেকর্ডিং এর জন্য তখন আমি বললাম আমি তাকে এখান থেকে ম্যাকবুক কিনে পাঠিয়ে দেবো সে যেন টাকাটা পরিশোধ করে দেয়। সে বললো সে ধীরে ধীরে টাকা পরিশোধ করে দেবে।
চট্রগ্রামে আমার এক ভাই থাকে শাহীন । শাহীন আমাকে অনেকদিন বলেছে আপু আমাকে একটা আইফোন কিনে দিবেন আমি আপনাকে টাকা দিয়ে দেবো। সেদিন শাহীন বললো মার্শাল নামের এক ছেলে তার এক বন্ধুর ভাগ্না কানাডা থাকে সে দেশে বেড়াতে আসছে। শরীফ খানের জন্য ম্যাকবুক আর শাহিনের জন্য একটি আইফোন কিনে আমি সেই মার্শাল টিটো ছেলেটার জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম । ভাবলাম মার্শাল টিটো যদি আমার অফিস থেকে এসে জিনিষ দুইটা নিয়ে যায় তাহলে আমি ওর হাতে দিয়ে দেবো এই ভেবে জিনিষগুলো বহন করে অফিসে নিয়ে এলাম। এসে জানলাম টিটো অনেক দূরের একটা বাসাতে এসে উঠেছে।
সেদিন আমার অন্য আর একটা দুরের অফিসে কাজ ছিল। এত কিছু হাত নিয়ে আমি সেখানে গেলাম । সেখান থেকে সেইসব জিনিষ নিয়ে আবার বাসায় ফিরে এলাম । পরেরদিন মার্শাল টিটোর টেক্সট পেলাম তার ফ্লাইট ডিলে । তখন আমি এয়ারপোর্ট গেলাম একটা ট্যাক্সি নিয়ে । ষাট ডলার খরচা করে এয়ারপোর্ট যেয়ে ম্যাকবুক আইফোন দিয়ে এলাম মার্শাল টিটোকে।
পরেরদিন শরীফ খান আমাকে ভিডিও কল করলো । সে ম্যাকবুক পেয়েছে । ভিডিও কল পেয়ে তার খুশী দেখার জন্য ক্যমেরার দিকে তাকাবার কিছুক্ষণ পরে শরীফ খান ক্যামেরা অফ করে দিলো। আমি অপমানিত বোধ করলাম এবং খুব রেগে গেলাম। সে জানালো তার মা ঘরে ঢুকার কারণে সে ক্যামেরা অফ করে দিয়েছে। তখন আমি খুব অবাক হয়ে গেলাম। আমি তাকে ক্রেডিট কার্ড চার্জ করে ঋণ দিয়ে ম্যাকবুক কিনে পাঠিয়েছি যার টাকা সে পরিশোধ করে দেবে, মাকেও সেটা সে জানাতে পারে। সমস্যা কোথায়? মায়ের ঘরে প্রবেশের সাথে সাথে ভিডিও ক্যামেরা অফ কেনো করবে সে ব্যাপারটা মাথায় ঢুকছিলনা আমার । কিছুক্ষণ পরে অনেকগুলা অডিও ক্লিপ পেলাম । শরীফ খান জানিয়েছে যে আমি তার বন্ধু । সে তার বন্ধুদের সাথে তার মায়ের আলাপ করিয়ে দেয়না। বাইরে থেকে কেউ তার বাসাতে আসেনা। ব্যাপারটা আমার কাছে বেশ নতুন মনে হলো। বন্ধুরা বাসাতে আসেনা। এমনকি ছেলে বন্ধুরাও আসেনা। একটু বেশী মনে হলো ব্যাপারটা। সেদিন ফেসবুকে দেখলাম তার মা, ভাই, বোন সবাই শিল্পকলা একাডেমীতে দাঁড়িয়ে আছে। শিল্পকলা একাডেমীতে তার অনেক পরিচিত আছে যারা তার মাকে দেখেছে। ফেসবুকের অনেক পরিচিত অপরিচিত মানুষেরা তার মা, বোন, ভাইকে দেখছে। সেদিন আমাকে ভিডিও কল দিয়ে শরীফ খান আমাকে তার খুশী দেখাবার জন্য ডেকে তার মায়ের জন্য ক্যামেরা অফ করে দেবার রহস্য এখনো আমি বুঝিনি।
২০১৮ সালের নভেম্বর মাসে আমি বিনু মাহবুবার সাথে ফেসবুকে এড হলে জানতে পারলাম সেই ম্যাকবুকটা আসলে আমেরিকা থেকে শাহীন ভাই পাঠিয়েছে।।.
চলবে
আয়শা মেহের
সম্পাদিকা
প্রবাসনিউ২৪
টরেন্টো, কানাডা

