জনগণের অর্থেই নির্মাণ হচ্ছে পদ্মা সেতু

বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের সাহসই আমার শক্তি। তাদের সাহাস্য সহযোগিতা আমাকে শক্তি যোগাচ্ছে। জনগণ স্বতস্ফুর্তভাবে পদ্মা সেতু নির্মাণে অর্থ দিতে চেয়েছে। জনগণের অর্থেই এখন পদ্মা সেতু নির্মাণ হচ্ছে।

শনিবার বেলা পৌনে ১২টায় শরিয়তপুরের জাজিরা পয়েন্টে নদী শাসনের কাজের উদ্বোধনের পর সুধী সমাবেশে প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা এ কথা বলেন।

তিনি বলেন, ‘প্রথম দফা ক্ষমতায় এসে আমি পদ্মা সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা করি কিন্তু ২০০১ সালে বিএনপি জামায়াত জোট ক্ষমতায় এনে সেতু নির্মাণের কাজ কাজকে পরিত্যাক্ত ঘোষণা করে। আমি আবার ২০০৮ সালের ক্ষমতায় এসে সরকার গঠনের পর আবার সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নিই। বিশ্ব ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি করি। কোনো অভিযোগ ছাড়াই বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির অভিযোগ এনে অর্থ সহযোগিতা বন্ধ করে দেয়। কিন্তু আজ পর্যন্ত বিশ্ব ব্যাংক সেই দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি। এ নিয়ে কানাডায় মামলা হয়েছে কানাডার আদালত বিশ্ব ব্যাংকের দুর্নীতির প্রমাণ দেখাতে বলেছে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে বিশ্ব ব্যাংকের কাছে চিঠি লিখেছিলাম দুর্নীতির কাগজ চেয়ে, কিন্তু তারা কাগজ দেখাতে পারেনি। তারা আমার চিঠির উত্তর দেয়নি। পরে অবশ্য বিশ্বব্যাংক দুটি কাগজ দেখিয়েছে। যা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেরতো নয়ই, পদ্মাসেতু সংক্রান্তও নয়। আসলে এখানে ঘটনা অন্য কিছু ছিল।’

এসময় নোবেল বিজয়ী ড. ইউনুসকে ইঙ্গিত করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এদেশের কোনো স্বনামধন্য বিশ্ববিখ্যাত ব্যক্তি (ইউনুস) একটা ব্যাংকের প্রধান ছিলেন। ওই ব্যক্তি ১১ বছর একটি ব্যাংকের এমডি ছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক তাকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিলে তিনি সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলায় হেরে গিয়ে তাকে এমডির পদ ছেড়ে দিতে হয়। তার কাছ থেকে বহু ই-মেইল গেছে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে। এসব ই-মেইলে সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার আহ্বান জানানো হয়। এক পর্যায়ে বিশ্ব ব্যাংকের সে সময়ের প্রেসিডেন্ট বোর্ডের কোনো অনুমোদন ছাড়া তার দায়িত্বের শেষ দিনে তিনি পদ্মা সেতু নির্মাণের অর্থ সহয়তা বন্ধ করার ঘোষণা করেন। আমি বিষয়টি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেই, সিদ্ধান্ত নেই বিশ্ব ব্যাংক থেকে টাকা নেবো না নিজেদের টাকায় সেতু নির্মাণ করবো, আমরা এখন সেটাই করে দেখাচ্ছি।’

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমি আমার পরিবারের সবাইকে হারিয়েছি। আমার বাবা জাতির পিতা এদেশের মানুষের জন্য অনেক কষ্ট করে গেছেন। তিনি দেশের মানুষের জন্য কারাভোগ করেছেন। অনেক কষ্ট করে আমরা এ পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছি। এদেশের মানুষদের নিয়ে এগিয়ে যেতে চাই।’

এ সেতু নির্মাণের ফলে ব্যাপক বিনিয়োগ বাড়বে নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তিনি বলেন, ‘এ সেতু নির্মাণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এশিয়ান হাইওয়েতেও যুক্ত হবে। আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটবে। বাংলাদেশের অর্থনীতির সমৃদ্ধ হবে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে অপার সম্ভাবনা রয়েছে। পদ্মা সেতুর ফলে সেই সম্ভাবনা কাজে লাগবে।’

প্রধানমন্ত্রী দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন বাংলাদেশের রিজার্ভ এখন ২৭ বিলিয়ন ডলার, সেখান থেকে দুই চার বিলিয়ন পদ্মা সেতুর জন্য খরচ করা সমস্যা হবে না।

সাম্প্রতিক বিভিন্ন জঙ্গি সংক্রান্ত ঘটনার প্রসঙ্গ এনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ কোনো জঙ্গিবাদের কোনো স্থান নেই, ইসলামে জঙ্গিবাদ, আত্মহত্যা হারাম। ইসলাম শান্তির ধর্ম। আপনারা কোনো ধরনের জঙ্গিবাদকে স্থান দিবেন না। সবাই মিলে জঙ্গিবাদ রুখে দিন।’

প্রসঙ্গত, নিজস্ব অর্থায়নে এটি দেশের সবচেয়ে বড় প্রকল্প। এর জন্য খরচ হবে প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা। এই সেতু হলে ঢাকার সঙ্গে সরাসরি সড়কপথে যুক্ত হবে দক্ষিণাঞ্চল। পূরণ হবে ওই অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন। সেতুর ওপর দিয়ে ট্রেনও চলবে। এশিয়ান হাইওয়ের পথ হিসেবেও এই সেতুটি ব্যবহৃত হবে। মাওয়া থেকে পোস্তগোলা পর্যন্ত চার লেনের সড়ক হবে। রাজধানীর বিজয়নগর থেকে ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে হবে ১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ উড়ালসড়ক। সেতুর ওপর দিয়ে ট্রেনও চলবে। এরইমধ্যে পদ্মা সেতু প্রকল্পের প্রায় ২৭ শতাংশ কাজ শেষ হয়ে গেছে বলে প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন।

২০১৮ সালের মধ্যে ছয় দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সেতু প্রকল্পের কাজ শেষ করার কথা। এতোদিন টেস্ট পাইলিং চললেও শনিবার শুরু হবে মূল পাইলিং। এজন্য নদীতে জড়ো করা হয়েছে বিশাল বিশাল ক্রেন, ড্রেজার। এ প্রকল্পে বিশ্ব ব্যাংক প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার ঋণ সহায়তার প্রস্তাব নিয়ে আসলেও ঘটে নানান ঘটনা। শেষ পর্যন্ত নিজস্ব অর্থায়নেই নির্মাণ হচ্ছে পদ্মা সেতু।

৪ thoughts on “জনগণের অর্থেই নির্মাণ হচ্ছে পদ্মা সেতু

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.