থেমে নেই ব্লাক মেইলিং ও চাঁদাবাজি সাংবাদিকতার আড়ালে নারী ব্যবসায়ী আরিফ এখনো বেপরোয়া

সোহেল মাহমুদঃ চাঁদাবাজির অভিযোগে ফরিদপুর প্রেসক্লাব থেকে আজিবনের জন্য বহিস্কৃত কথিত সাংবাদিক আরিফ ইসলাম এখন ফরিদপুরের জনপদে এক আতঙ্কের নাম। সম্প্রতি পুলিশী অভিযানে তার নারী ব্যবসা বন্ধ হরেও মিথ্যা সংবাদ পরিবেশনের সংবাদ ভয় দেখিয়ে মানুষকে নিয়মিত ব্ল্যাক মেইলিং করা ও নানা কৌশলে তার চাঁদাবাজি এখনো বন্ধ হয়নি। টাকার জন্য পারে না এহেন কাজ নেই যেনো তার কাছে। ফরিদপুরের মাটিতে কান পাতলে এখন শোনা যাচ্ছে কথিত এই সাংবাদিকের জানা অজানা নানান লোমহর্ষক কাহিনী। তবে বিস্ময়করজনক হলেও সত্য একের পর এক চাঁদাবাজি, নারী ব্যবসা ও মানুষকে নিউজ ছাপানোর নামে ব্ল্যাক মেইলিংয়ের মতো দুস্কর্ম করেও বহাল তবিয়তেই সে পার পেয়ে যাচ্ছে। বরাবরের ক্ষমতাশীন মহলকে ফুঁলিয়ে ফাঁপিয়ে এখন নিজের অতীত কুকর্মের সাজা হতে রেহাই পেতেও আরিফ বেশ তৎপর রয়েছে বলে জানা গেছে।

ফরিদপুরের এই কথিত সাংবাদিকের বিরুদ্ধে নানাজনের নিকট থেকে অভিযোগ পেয়ে তার সম্মন্ধে খোঁজখবর নিয়ে পাওয়া গেছে ভয়ংকর সব তথ্য। সাংবাদিকতা পেশা তার পরিচয় হলেও মূলত আপন ভগ্নিপতির হোটেলে মাদক ও নারী ব্যবসার পার্টনার, সাংবাদিক সংগঠনের নামে লাখ লাখ টাকার চাঁদাবাজি ও প্রেসক্লাবের তহবিল ও অনুদান তছরুফ, পত্রিকায় নিউজ প্রকাশের নামে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বসহ বিভিন্নজনকে ভয়ভীতি দেখিয়ে ব্ল্যাক মেইলিং করে নিয়মিত অবৈধ টাকা পয়সা আদায়, নিরীহ মানুষকে জেল-পুলিশের ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়সহ নানা কর্মকান্ডে তার জড়িত থাকার প্রমাণ এখন ফরিদপুরবাসীর মুখে মুখে ফিরছে। তাদের একটিই কথা আরিফের মতো সাংবাদিক যতোদিন ফরিদপুরে সাংবাদিকতা করে যাবে ততোদিন ফরিদপুরের সাংবাদিকতার পরিবেশ উন্নয়ন হবে না। আটরশিতে গুলিতে মানুষ মেরে ফেলার মিথ্যা খবর দিয়ে আরিফের সাংবাদিকতা জীবনের শুরু হয়েছিল। এখনও সেভাবেই একের পর মিথ্যা সংবাদ সে ছেপে যাচ্ছে। সম্প্রতি কানাইপুরে হেলিকপ্টার বিধ্বস্তের মিথ্যা গুজব এনটিভিতে প্রচার করে জেলা প্রশাসন ও পুলিশের নিকট ক্ষমা চেয়ে পার পায় সে। জানা গেছে, সাংবাদিকতার খোলসে ঋষ্টপুষ্ট এই চাঁদাবাজ আরিফের চাঁদার দৌরাত্ম থেকে বাদ যাননি বর্তমান হাসিনা সরকারের অন্যতম প্রভাবশালী মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনও। আরিফের দৌরাত্ম কতো দুর? এ তথ্য জানতে চাইলে তার এককালের সহকর্মীরা জানান এতথ্য। তারা জানান, পরিণতি বিবেচনা না করেই ফরিদপুর প্রেসক্লাবে সেমিনার করার নামে আরিফ মন্ত্রীর ঢাকার বাসায় গিয়ে তাঁর নিকট চাঁদা চেয়ে বসে। এতে বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ মন্ত্রী তখন আরিফকে চাঁদাবাজ হিসেবে ব্যাপক ভৎসর্না করেন। মন্ত্রী আরিফের চাঁদাবাজির ঘটনা তার ঘনিষ্টজন ও দলীয় লোকদের কাছে জানান। খবরটি ফরিদপুরের সাংবাদিক মহলে এসে পৌছালে পুরো মহলে ঢি-ঢি পড়ে যায়। সেমিনারের নামে আরিফ ঢাকায় অবস্থানরত ফরিদপুরের অনেক ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর নিকট থেকেও মোটা অংকের চাঁদাবাজি করতে থাকে। অবশেষে আরিফকে চাঁদাবাজির প্রমানিত অভিযোগে ফরিদপুর প্রেসক্লাব থেকে বহিস্কার করা হয়। আরিফের এককালের সহকর্মীদের মন্তব্য এমন যে, মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নিকট চাঁদা চাওয়ার মাধ্যমেই জানা যায় আসলে আরিফ কতো বড় চাঁদাবাজ! চারদলীয় জোট সরকারের আমলে আরিফ ফরিদপুরের পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের নামে ৫ টন গম তুলে আত্মসাৎ করে বলে জানা গেছে। ওই সময়ে নগরকান্দায় তার এক ভগ্নিপতির ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠানে ভুয়া অগ্নিকান্ডের খবর পত্রিকায় ছেপে বিশাল মোটা অংকের টাকা আরিফ ও তার ভগ্নিপতি হাতিয়ে নেয় বলেও তারা জানান।

জানা গেছে, ফরিদপুরের মহিম ইন্সটিটিউট থেকে মেট্রিক পাশ করে ইয়াছিন কলেজে ভর্তি হলেও আরিফের পক্ষে সম্ভব হয়নি উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করার। এরপর বড় ভাই কাদেরদি কলেজের শিক্ষক হওয়ার সুবাদে সে কাদিরদি কলেজ থেকে বিএ পাশের একটি ভুয়া সার্টিফিকেট সংগ্রহ করে আমার দেশ ও এনটিভিতে ফরিদপুরের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেয়। তবে ফেসবুকে সে নিজেকে রাজেন্দ্র কলেজ হতে গ্রাজুয়েট হিসেবে পরিচয় দিচ্ছে। নব্বইয়ের দশকে নগরকান্দার আবুল হোসেন সম্পাদিত আজকের প্রত্যাশা নামে একটি অখ্যাত পত্রিকা দিয়ে আরিফের সাংবাদিকতা জগতের হাতেকড়ি হয়। সেসময়ে ক্ষমতায় ছিল বিএনপি দল। ইয়াছিন কলেজে এককালের ছাত্রদল কর্মী আরিফ বিএনপি নেতাদের ব্যবহার করে তখন থেকেই পুলিশ ও প্রশাসনের উপর খবরদারি করতো। এভাবে সে একের পর নিরীহ মানুষকে ব্ল্যাকমেইলিংয়ে সিদ্ধ হস্ত হয়ে উঠে। ফরিদপুরের ব্যতিক্রমী এই চাঁদাবাজ মওকা পেলেই মাইক্রোবাস নিয়ে হাজির হন অকুস্থলে। চাহিদামতো টাকা না দিলেই লিখে দেন উল্টো মিথ্যা নিউজ। যার বিরাট নজির সে স্থাপন করেছে সম্প্রতি নগরকান্দা পৌর নির্বাচনে। এই ফরিদপুরের মানুষকে সে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধেছে তার ব্ল্যাকমেইলিং ও চাঁদাবজির কঠিন জালে। মানুষকে ব্ল্যাকমেইলিং ছাড়াও তার আয়ের উৎস হচ্ছে নারী ব্যবসা। পতিতালয় থেকে নিয়মিত বখরা আদায়ও করতো আরিফ। ৯৬ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতা ছাড়ার পর আওয়ামী লীগের আমলের পরবর্তী ৫ বছর তথা ২০০০ সাল পর্যন্ত আরিফ ছিল ফরিদপুরের প্রয়াত রাজনীতিবীদ হাসিবুর হাসান লাবলুর ছত্রচ্ছায়ায়। লাবলুর প্রশ্রয়েই বিএনপির লোক হলেও সেসময়ে আরিফ পার পেয়ে যায় তার যাবতীয় কুকর্ম থেকে। এরপর বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় বিএনপি নেতা মোসাদ্দেক হোসেন ফালুর মালিকানাধীন স্যাটেলাইট টেলিভিশন ‘এনটিভি’ তে সে ফরিদপুর প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেয়। ফরিদপুরে তৎকালীন মন্ত্রী কামাল ইবনে ইউসুফের নাম ভাঙিয়ে দোর্দন্ড প্রতাপে অপসাংবাদিকতা চালাতে থাকে। ডিসি এসপিকে থোড়াই কেয়ার করতো সে। এসময় এসময় তার অপরাধ দেশের গন্ডি ছেড়ে পাশ্ববর্তী ভারতেও বিস্তার লাভ করে। জানা গেছে, সেসময়ে আরিফ চোরাচালানের সাথে জড়িত হয়ে পরে। চিকিৎসার নামে প্রতি ৩ মাস অন্তর ভারতে যেতো আরিফ চোরাচালানে। দেশে থাকতে সাংবাদিকতা পরিচয় ও সাংবাদিক সংগঠনের নেতা হওয়ার সুবাদে তার কুকর্ম আড়ালে আবডালে থাকলেও সর্বপ্রথম তার কুকীর্তি ফাঁস হয় ভারতের মাটিতেই। চারদলীয় জোট সরকারের শেষের দিকে তাকে পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁ থানা পুলিশ একটি আবাসিক হোটেল থেকে হেরোইন ও পতিতা সহ আটক করে। খবরটি দ্রুতই এসে পৌছে ফরিদপুরে। অবশ্য তৎকালে সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তির তদবীর ও বনগাঁ পুলিশকে মোটা অংকের টাকা দিয়ে আরিফ সেযাত্রায় ছাড়া পেয়ে দেশে ফিরে আসে। তবে সেসময় থেকেই আরিফের অনৈতিক কর্মকান্ডের বিষয়টি জানাজানি হতে থাকে পরিচিত মহলে। এর প্রতিবাদ হতে থাকে ফরিদপুরের সাংবাদিকতা মহলে। মানুষকে ব্ল্যাকমেইলিং ছাড়াও আলোচনায় উঠে আসে আরিফের নারী ও চোরাচালান ব্যবসার কথাও। তবে ধুরন্ধর আরিফ ক্ষমতাশীনদের মাধ্যমে ম্যানেজ করে সে যাত্রায় নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়। জানা যায়, এরপরও দীর্ঘদিন যাবত আরিফ নারী ও মাদক ব্যবসা করে আসলেও তাকে নিবৃত্ত করা যায়নি কোনভাবেই। আপন ভগ্নিপতির নারী ব্যবসাকে সে সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে প্রশ্রয় দিয়ে মোটা অংকের টাকা কামাই করেছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর কামাল ইবনে ইউসুফের ঋণ শোধ করতে সে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনের পরিবারের ঐতিহ্য নষ্ট করার খেলায় মেতে ওঠে। দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায় মোশাররফ হোসেনের পিতার নামে একটি মিথ্যা সংবাদ ছেপে সে রাতারাতি দেশখ্যাত হতে চেয়েছিল। জানা গেছে, তৎকালীন জেলা আওয়ামী লীগের মধ্যে মন্ত্রী মোশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধ অংশের নেতা লাবলু পক্ষ থেকে ২ লাখ টাকা উৎকোচ নিয়ে আরিফ ওই সংবাদটি প্রকাশ করে আমার দেশে। কিন্তু মিথ্যা ওই সংবাদ প্রকাশের পর ফরিদপুরের মানুষ তার প্রতি ঘৃনা প্রকাশ করতে থাকে। আরিফের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ মানুষ একের পর এক মামলা করতে থাকে আদালতে। ফরিদপুরের সাংবাদিক মহল তার এসব কুকীর্তির কথা জানতে পেরে তার সঙ্গ ছাড়তে থাকে। একারণে আরিফের বিরুদ্ধে মামলা ও পুলিশের আটকের পর তার জন্য ফরিদপুরের সাংবাদিকমহল প্রতিবাদ-মানববন্ধনতো দুরের কথা, একটি বিবৃতি পর্যন্তও দেয়নি। এসব মামলায় জেল খেটে বেরিয়ে আসার আগেই আমার দেশ পত্রিকাটি বন্ধ করে দেয়া হয়। আরিফের কবল থেকে যেনো মুক্তি পায় ফরিদপুরের মানুষ। কিন্তু জেল থেকে বেরিয়ে ধীরে ধীরে আরিফ আবার নিজের অবস্থান সুসংহত করতে থাকে সেসময়ে জেলা আওয়ামী লীগের সবচেয়ে দাপুটে নেতা মোকাররম বাবুর মাধ্যমে। আরিফের আপন ভগ্নিপতি শরিয়তুল্লাহ বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলামের ব্যবসায়ীক পার্টনার হওয়ার সুবাদে আরিফ মোকাররম বাবুর মাধ্যমে মন্ত্রী ও তার ভাই খন্দকার মোহতেশাম হোসেনের কাছ থেকে সুবিধা ভোগ করছেন।

এখনও আরিফ তার অনলাইন আমার ফরিদপুরে সাংবাদিকতার মতো মহান পেশাকে ব্যবহার করে একের পর এক মানুষকে ‘ব্ল্যাক মেইল’ করে যাচ্ছে। সাংবাদিকতার নিয়ননীতির প্রতি তোয়াক্কা না করে প্রতিহিংসা পরায়ণের মতো একের পর এক মানুষের নামে মিথ্যা সংবাদ প্রকাশ করছে তার পরিচালিত অনলাইন ‘আমার ফরিদপুর’ এ। তার এ কান্ডকীর্তি এখন ফরিদপুরের সাংবাদিকতা মহলে নানা গুঞ্জণের জন্ম দিচ্ছে। ‘‘টাকার জন্য আরিফ এখন পুরো হন্নে হয়ে গেছে। যা ইচ্ছা তাই লিখছে। একসময় টাকা খেয়ে যাকে সমাজের কাছে হেয় করেছে গা বাঁচানোর জন্য এখন তাকেই হিরো বানাচ্ছে, আবার যাদের আনুকূল্য পেতে এসময় তাদের পিছে পিছে ঘুরেছে তাদেরই বিরুদ্ধে একের পর এক কুৎসা রটাচ্ছে। ফেসবুকে আরিফের রয়েছে একাধিক ফেক একাউন্ট। কখনো ভুয়া নামে, কখনো নিজের স্ত্রী-মেয়ের নামে এসব আইডি খোলা হচ্ছে। এসব একাউন্টের অধিকাংশই পর্ণ জাতীয় কনটেন্টে ভরা। তার নিজের একাউন্টেও মাঝেমধ্যেই নারীদের উত্তেজনাকর ছবি হরহামেশা আপলোড করা হচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষের দূর্বলতাকে পুজি করে বিভিন্ন পোষ্ট আপলোড করা হচ্ছে বিভিন্ন ফেক আইডিতে। আবার নিজেই ভুয়া নামে সেসব পোষ্টের তারিফ করে অন্যদের আকৃষ্ট করছে তাতে মন্তব্য করতে। আরিফ কী উম্মাদ হয়ে গেছে!’’ আরিফ সম্মন্ধে এমনই মূল্যায়ন উঠে এসেছে ফরিদপুরের বিভিন্ন সাংবাদিকদের সাথে কথা বলে। তাদের একটাই কথা, সাংবাদিকতার আড়ালে আবাসিক হোটেলে দেহ ব্যবসা করে, সাংবাদিকতার নামে দিনের পর দিন মানুষকে ব্ল্যাক মেইলিং করে আর কতো কাল পার পেয়ে যাবে এই কথিত সাংবাদিক। অবশ্য, এসব অভিযোগের ব্যাপারে আরিফের সাথে যোগাযোগ করা হলে আরিফ এসবই তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার বলে উল্লেখ করে বলেন, তিনি ফরিদপুরের একজন অন্যতম অ্যাক্টিভ জার্নালিষ্ট। গ্রাজুয়েট ফ্রম রাজেন্দ্র কলেজ। ভারতে তাকে মিথ্যা অভিযোগ তার শত্রুরা তাকে আটক করিয়েছিল। মন্ত্রীর কাছে চাঁদাবজির ঘটনাটি সত্য নয়। তিনি কখনো পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের নামে কোন অনুদান তুলেননি। মানুষকে ব্ল্যাক মেইলিং করা বা মিথ্যা নিউজ তিনি কখনো করেন না।

জিখান/প্রবাসনিউজ২৪.কম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.