পাঁচ বছর আগে সিরিয়াতে যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছিল তাতে নিহত হয়েছিল ২৫০,০০০ সিরিয়ান। ১১ মিলিয়ন সিরিয়ান বসতহারা হয়। ২০১১ সালের আরব স্প্রিং এর সপক্ষে দেওয়ালে চিকা মারার জন্য ১৫ বছরের একটি ছেলেকে গ্রেফতার ও নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনে অন্য একজন ১৩ বছরের ছেলে হামযা আল খাতিব মারা যায়। এভাবেই শুরু । আরব স্পিং এর সপক্ষে যারা আন্দোলনে অংশ নেয় তাদের উপর চলে অমানবিক নির্যাতন। সিরিয়ান আর্মী বিদ্রোহ করে প্রেসিডেন্ট আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চায় কিন্তু সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। ১৯৮২ সালে প্রেসিডেন্ট আসাদের পিতা হাফেজ একটি ইসলামী দল হামা’কে আক্রমণ করার জন্য আর্মীকে নির্দেশ দেয়। এই আক্রমণে ১০,০০০-৪০,০০০ মানুষকে হত্যা করা হয়।
যেকোন দেশে বোমা বর্ষন ও সেই দেশে বিদেশীদের নিয়ন্ত্রন নেবার আগে বিদেশীরা সেই দেশে গৃহযুদ্ধ প্রকল্প গ্রহণ করে আর সেটা করার জন্য কিছু দেশী মানুষকে বেতন দিয়ে নিয়োগ করে। এদেরকে বলা হয় দালাল বা রাস্ট্রদ্রোহী বা কুত্তা।
ইরাক আক্রমণ করার আগেও অনেক ইরাকী বিদেশীদের এজেন্ট হিসাবে যোগ দেয়। ইংরেজ উপনিবেশ শাসনামলে এইসব দালালেরা ছিল গান্ধী, নেহেরু, জিন্নাহ ইত্যাদি । পরবর্তীকালে ছিল মুজিব, ভুট্টো, হাসিনা, খালেদা ইত্যাদি। যাইহোক, তারপর সিরিয়াতে খড়া নামে । ২০০৭-২০০১০ এর খড়াতে এদিক ওদিকে ছড়িয়ে পড়ে ১.৫ মিলিয়ন সিরিয়ান। এছাড়া বিভিন্ন দেশ থেকে আসা রিফুজিদের বিভিন্নভাবে সাম্প্রদায়িক কলহে লিপ্ত করা হয়। সরকারের লোকজন যারা ইরাক ও ইরান থেকে এসেছে তারা ও লেবানিজ হিজবুল্লা আসাদের সাথে থাকে। সিরিয়াতে সুন্নি সংখ্যাগরিষ্টের সমর্থনে ছিল টার্ক, কাতার, সাউদী আরব ও কিছু বিচ্ছিন্ন বিদ্রোহীরা।
২০১৪ তে আইসিস বা আইসিল (ইসলামিক স্টেট অফ ইরাক এন্ড দ্য লেভেন্ট)এসে যোগ দিয়ে সিরিয়াকে বিশাল যুদ্ধক্ষেত্র ও ধংসস্তুপে পরিনত করতে সাহায্য করে। বিদেশীরাই মূলত সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের ইন্ধনদাতা। সর্বকালে সব দেশেই বিদেশীরা দেশের ভেতরের লোভী রাস্ট্রদ্রোহীদের সাহায্যে যুদ্ধ বিগ্রহ লাগায়ে দিয়ে দেশের সম্পদ লুট করতে এবং দেশের মানুষকে হত্যা করে থাকে।
সাউথ আফ্রিকা থেকে কালোদের ধরে বেঁধে এনে দাস হিসাবে বিক্রি করতে ইংরেজদের যারা সাহায্য করেছিল তারা সাউথ আফ্রিকার অধিবাসীই ছিল। বিশ্বের সব দেশেই দালাল বা রাস্ট্রদ্রোহী বা কুত্তা রয়েছে যারা নিজভূমে আগুন লাগায় আর নিজের ভাইয়ের পিঠে ছোঁড়া ভুকে। পূর্ব বাংলার প্রতিটি গণআন্দোলন ব্যর্থ হবার কারন হলো প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের বিক্রি হয়ে যাওয়া।
সেপ্টেম্বর ২০১৫ সালে প্রেসিডেন্ট আসাদকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে রাশিয়া। বোমা বর্ষন করে আইসিসদের নিধন করার উদ্দ্যেশে। ঠিক এক বছর আগে এই সময়ে হাজার হাজার সিরিয়ান ঘর ফেলে পালিয়ে যেতে থাকে। সমুদ্রের ডেউয়ের মত সিরিয়ানরা ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সীমান্তে এসে আছড়ে পড়ে। বেশীরভাগ দেশই রিফুউজীদের মুখের উপরে সীমান্ত বন্ধ করে দেয়।
২০১১-২০১৬ সিরিয়া যুদ্ধে প্রায় আশি হাজার সাধারন মানুষ নিহত হয়। অক্টোবর, ২০১৫ তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এক বিশেষ প্রগ্রামে সিরিয়ার জংগীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে যাতে তারা রাশিয়ান ও আসাদের সৈন্যদের সাথে যুদ্ধ করতে পারে।
অন্যদিকে একটি কুর্দিশ গ্রুপ সিরিয়ার দক্ষিনে স্বায়ত্ব শাসন ঘোষনা করলে তুরস্ক এই ব্যপারে হস্তক্ষেপ করে। কুর্দিশ এই গ্রুপ তুরস্ক, এবং আইসিসের সাথে যুদ্ধ করে এখনো এই এলাকাতে টিকে আছে। আসাদের গ্রুপ মূলত রাজধানী দামাস্কাসে, উত্তরে, আলেপ্পোতে, লেবানিজ বর্ডার ঘেষে টিকে আছে। বাকী সিরিয়াতে আইসিস আর খন্ড খন্ড সাম্প্রাদায়িক গ্রুপেরা নিয়ন্ত্রন বজায় রেখেছে। সাধারণ মানুষেরা যারা সিরিয়া থেকে বের হতে পারেনি তারা জীবন্মৃত অবস্থায় রয়েছে। বিদেশীদের প্যাঁচ এখন জটিল অবস্থা ধারণ করেছে । সিরিয়াতে শান্তি ফিরে আসা এখন শুধুই স্বপ্ন।
সিরিয়ার পূর্বে রয়েছে ইরাক। পশ্চিমে লেবানন এবং ভূমধ্যসাগর। দক্ষিনে তুরস্ক আর উত্তরে জর্ডান এবং উত্তর পশ্চিমে রয়েছে ইসরায়েল।
৯/১১ এর পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরাক আক্রমণ করে তখন ইরাক থেকে প্রায় দেড় মিলিয়ন মানুষ সিরিয়াতে যেয়ে আশ্রয় নেয়। এর আগে পালেস্টাইনীরা তো ছিলই। পালেস্টাইনে ইসরায়েলী আক্রমণের বয়স সত্তরেরও বেশী বছর। অতীতে ইসরায়েল যখন পালেস্টাইন আক্রমন করে তখন বেশিরভাগ পালেস্টাইনীরা হয় লেবানন নাহয় সিরিয়াতে যেয়ে আশ্রয় নিয়েছে।
৯/১১ এর পরে ইরাক আক্রমণ করার আগে মার্কিন যক্তরাষ্ট্র তুরস্কে তাদের সেনাঘাটি স্থাপন করার জন্য অনুমতি চাইলে তুরস্কের পার্লামেন্টের সদস্যরা সেই প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। প্রতিবাদে মুখরিত সমগ্র তুরস্কের মানুষ নেমে আসেন রাজপথে।এর আগে সাদ্দাম হোসেন যখন কুর্দিশদের উপরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি বোমা ব্যবহার তখন অনেক কুর্দিশ ইরাক ছেড়ে তুরস্কে যেয়ে আশ্রয় নেয়। তুরস্ক এমন একটি জাগাতে অবস্থিত যা এশিয়া, আরব ও ইউরোপের মধ্য সেতুর মত সংযোগ স্থাপন করে। ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময় কুর্দিশ গণহত্যা আল-আনফাল ক্যাম্পেনকে গণহত্যা হিসাবে স্বীকার করে নেয় আন্তর্জাতিক মহল। মিয়ানমারের গণহত্যাকে গণহত্যা হিসাবে স্বীকার করেনা আন্তর্জাতিক মহল কারণ মিয়ানমারে কোন খনিজ সম্পদ নাই। রাখাইন রাজ্যের মুসলমানদের তাড়িয়ে দিয়ে সেখানে ইন্ডাস্টি বিশেষ করে বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে মিয়ানমার সরকার। মিয়ানমারের গণহত্যার সাথে পালেস্টাইন গণহত্যার তুলনা করা যেতে পারে। পালেস্টাইনে গণহত্যা চালানোর জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রীতিমত অর্থায়ন ও অস্ত্র সরবরাহ করে। বলাই বাহুল্য ইহুদীরাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বোমা ও বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র বানাবার কারখানাগুলোর মালিক। আরবের আরো একটি দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে অস্ত্র ক্রয় করে সেটি হলো সৌদী আরব। প্যালেস্টাইনের ও মিয়ানমারের গণহত্যার কারণ হলো জমি দখল। জমি দখল করার জন্য গণহত্যা বা মশামাছির মত মানুষ হত্যা।
সিরিয়ার জনসংখ্যা ছিল ২২.৮৫ মিলিয়ন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরাক আক্রমণ করার আগে ইরাকের জনসংখ্যা ছিল ২৩ মিলিয়ন। মৃতদেহ গণনা থেকে জানা যায় প্রথম চার বছরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আক্রমন ও দখলের ফলে ১৫১,০০০ – ১,১৫০,০০০ ইরাকীর মৃত্যু হয়। এরা সবাই ছিল সাধারণ ইরাকী। প্রায় দুই মিলিয়ন ইরাকী রিফুজি হিসাবে পার্শবর্তী সিরিয়া, লেবানন, তুরস্ক ইত্যাদী দেশগুলোতে আশ্রয় নেয়।
অতীতে ইংরেজ বাহাদুর বিভিন্ন দেশ থেকে তাদের উপনিবেশ গুটিয়ে নিতো যখন দেখতো তাদের এইসব দেশে থাকা লাভজনক না। গুটিয়ে নেবার আগে ইংরেজরা বিশ্বের সব উপনিবেশেই বিভাজন ও শাসন নীতির মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বীজ বপন করে এসেছে। যেই বিষ বীজ থেকে এখন ঘৃণা ও সাম্প্রদায়িকতাঁর মহীরুহ হয়ে গেছে । সাম্প্রদায়িকতা এখন নিয়ম হয়ে গেছে। ঠিক একইভাবে ইরাক আক্রমণ, দখল ও ধবংসের পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরাক ও সিরিয়াতে একটি দল তৈরি করে যার নাম আইসিস বা আইসিল (ইসলামিক স্টেট অফ ইরাক এন্ড লেভেন্ট – ISIS – Islamic State of Iraq and Levant)। বাংলাদেশে যেমন ভারত আওয়ামীলীগের পৃষ্টপোষকতা করছে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে এবং পরবর্তীকালে সফলভাবে পূর্ব বাংলা দখল ও আওয়ামীলীগের মাধ্যমে শাসন করছে ঠিক একইভাবে আইসিস গঠন করা হয়েছে ইরাক ও সিরিয়াতে সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ট করে রাখার জন্য। সবাই ব্যস্ত থাকবে আইসিস জঙ্গি সামলাতে অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শান্তিতে তেল ও অন্যান্য খনিজ সম্পদ লুট করবে। তারপর আইসিসকে ধ্বংস করার নামে সিরিয়াতে বোমাবর্ষন করা হবে এবং প্রচুর মানুষকে গৃহহারা করা হবে। বিদেশীদের এই পরিকল্পনা এখন সিরিয়াতে সফল হয়েছে। হাজার হাজার সিরিয়ান তুরস্কের মধ্য দিয়ে ইউরোপে ঢোকার চেষ্টা করলে বিভিন্ন দেশ তাদেরকে বাঁধা দেয় । অন্যদিকে জার্মান ও ক্যানাডা প্রচুর সংখ্যক সিরিয়ান রিফুউজীকে তাদের দেশে আশ্রয় দেয়।
১৯৭১ সালে পূর্ব বাংলাতে গণহত্যা চলাকালীন সময়ে বহু মানুষ রিফুজি হিসাবে ভারতে যেয়ে আশ্রয় নেয়। পূর্ব বাংলার রিফুউজিদের নামে সাড়া বিশ্ব থেকে ভারতে সাহায্য আসে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য দেয় একশত বিলিয়ন ডলার। পূর্ব বাংলার গণহত্যা ছিল সুপরিকল্পিত গণহত্যা। সাড়া বিশ্ব থেকে আর্থিক সাহায্য, খাদ্য, কাপড়, কম্বল সাহায্য ছাড়াও এই গনহত্যা ভারতের জন্য পূর্ব বাংলা দখলকে একটি “ত্রাণ” হিসাবে চিহ্নিত করেছে। পাকিস্তান সামরিক সরকার যদি গণহত্যা না চালাতো তাহলে পরোক্ষভাবে পূর্ব বাংলার ক্ষমতা ভারতের কাছে হস্তান্তরিত হতোনা। প্রতিটি গণহত্যা, বোমাবর্ষণ, ও দেশ দখলের পেছনে কারণ একটাই তা হলো সেদেশের সম্পদ লুট। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা রিফুজিদেরকে বাংলাদেশে ঢুকতে দেওয়া হয়না। নৌকাতে গুলি করে রোহিঙ্গাদের হত্যা করে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডেরা কারণ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিলে ভারত তথা বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের কোন মুনাফা নাই।
কানাডাতে যেসব সিরিয়ানদের আশ্রয় দেওয়া হয়েছে তারা প্রায় সবাই ইরাক ও সিরিয়াতে প্রচুর সম্পদের মালিক। বিভিন্ন সময়ে যুদ্ধের কারণে এরা সবাই মোটামুটি সতর্ক এবং নিজেদের জীবন ও সম্পদ বাঁচাতে সক্ষম হয়েছে। যারা কপর্দকশূন্য তাদের ভেতরে নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ, কিশোর যারা ছিল তাদের অনেকেই সীমান্ত প্রহরীদের বেয়োনেডের খোঁচাতে আহত হয়েছে, ক্ষুধায় মারা গেছে, ক্ষুধার কারণে অনেকেই দেহ ব্যবসা ও নানা ধরণের অপরাধকর্মে জড়িয়ে গেছে। যেমন মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা থাইল্যান্ডে যেমন দেহ ব্যবসা ও নানা ধরণের অপরাধকর্মে ব্যবহৃত হচ্ছে।
রাজাই রাজাই লড়াই হয় আর সাধারণ মানুষের প্রানান্ত ।




