মুক্ত কথা বনাম ঘৃণা বাচক কথা বনাম ধর্মনিন্দা

[লেখাটি লিখেছে জনপ্রিয় মাইক্রোব্লগার সাবিনা আহমেদ]
আমরা সবাই মুক্ত কথা বা ফ্রী স্পীচ বলতে কোন প্রকার সেন্সরশিপ এবং দমন ছাড়া মতামত প্রকাশ করাকে বুঝি।

অপরদিকে ঘৃণাবাচক কথা বা হেইট স্পীচ হচ্ছে জাতী, ধর্ম, বর্ণ, যৌন ওরিয়েন্টেশান, অক্ষমতা, ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে অন্যকে কথার দারা আঘাত, আহত, এবং অপমান করা। স্পেশাল কিছু ক্ষেত্র ছাড়া হেইট স্পীচ আইনত দন্ডনিয় অপরাধ নয়।

ধর্মনিন্দা বা ব্লাসফেমি হচ্ছে আল্লাহ বা সৃষ্টিকর্তা বা পবিত্র জিনিস হিসাবে মানুষ যা গন্য করে তার বিরুদ্ধে কোন অপরাধ বা কথা বলা। ইচ্ছাকৃত ধর্ম নিন্দা বাংলাদেশে সহ অনেক দেশেই আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

মনে রাখা দরকার, সব ফ্রী স্পীচ, ফ্রী স্পীচ নয়। কোন কোন ফ্রী স্পীচ হয়ে পড়ে হেইট স্পীচ। আবার সব হেইট স্পীচ ব্লাসফেমি নয়।

মানুষ অনেক ক্ষেত্রেই ফ্রী স্পীচ, হেইট স্পীচ আর ব্লাসফেমির মধ্যকার পার্থক্য বুঝতে সক্ষম হয় না। ফ্রী স্পীচ এর হরদম ব্যাবহার অনেক ক্ষেত্রে হেইট স্পীচ এ পরিনত হয়। অপরদিকে ফ্রি স্পীচ আর হেইট স্পীচ বিচারকালে মানুষ প্রতিনিয়ত ডাবল স্ট্যান্ডার্ড মেইন্টেন করে। আর এই কারনেই প্রতিটি সভ্য সমাজ বাক স্বাধীনতা কোন কোন ক্ষেত্রে সীমিত করে।

সভ্য সমাজ হেইট স্পীচকে নিরুৎসাহিত করে এবং কিছু স্পেশাল ক্ষেত্রে অপরাধ হিসাবেও গন্য করে। যেমন আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট ১৯৫২ সালে “গ্রুপ পরনিন্দা” আইন বহাল রাখে যেখানে “মানুষের জাতী, বর্ণ, ধর্ম কে কটাক্ষ করে ঘৃণা, উপহাস, বা অপমান সুচক লেখা পাবলিশ করা আইনত অপরাধ।”

সমাজের সব সম্প্রদায়ের মঙ্গল এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। সমাজের কথা চিন্তা করে হেইট স্পীচকে নিয়ন্ত্রন করার জন্য সামাজিক কিছু পলিসি থাকে। হেইট স্পিচের ব্যাপারে আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রোজেনবম সাম্প্রতিক কালে কিছু গবেষণা তুলে ধরে বলেন, “মানসিক ক্ষতির তীব্রতা শরীরের আঘাতের সমান। বরঞ্চ মানসিক আঘাত আরও বেশি দীর্ঘস্থায়ী এবং ক্ষতিকর।“ তিনি বলেন, হেইট স্পীচের ভিকটিম হেইট ক্রাইম ভিক্টিমের সমান কিংবা তার চাইতে বেশি ঘৃণার শিকার হয়ে থাকে এবং ভুক্তভোগী।“

তাই তিনি প্রশ্ন করেন, যা আমারও প্রশ্ন, “কেন আইন থেকে হেইট স্পীচকে অব্যহতি দেয়া হয় যেখানে জনকল্যানের উপর এর নেতিবাচক প্রভাব এবং সামাজিক মুল্য শারীরিক আঘাতের চাইতেও বেশি?”

ধর্ম আর ধর্মীয় অনুভূতি মানুষের অন্তরের অন্তরস্থলের অনুভূতি। কারো ধর্মীয় অনুভূতি কে আঘাত করা তাকে শারীরিকভাবে আঘাত করার শামিল। আর মানুষের কথাও খুব শক্তিশালী। বাক স্বাধীনতার নামে ইচ্ছাকৃতভাবে এমন কিছু বলা উচিৎ নয় যা অন্যদের উত্তেজিত করে বেআইনি কাজ করার জন্য প্ররোচিত করে।

সাম্প্রতিক কালে ফ্রান্সে চার্লি হেবডো কেইসের ঠিক পরপরি পোপ ফ্রান্সিস সাংবাদিকদের বলেন, … “responding violently to one’s religion being mocked or insulted was ‘natural’. ….if a Vatican official standing nearby were to do such a thing to him, he could ‘expect to get punched in the nose.”

ফ্রি স্পীচ, হেইট স্পীচ, আর ব্লাস্ফেমির মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারা কমনসেন্সের ব্যাপার। যা আজকাল আর খুব বেশি কমন নেই। সমাজের এক শ্রেনির কাছে অপরের ধর্মকে আঘাত করা বেশ কিছুদিন ধরে অদ্ভুত এক ফ্যাশানেবল ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সব সচেতন নাগরিকের উচিৎ নিজেকে অপরের ধর্মকে কটাক্ষ, আক্রমণ, না জেনে নিজ মত করে ব্যাখ্যা দেয়া থেকে বিরত রাখা।

অভিজিৎ অবশ্যই হেইট স্পীচ এর অভিযোগে অভিযুক্ত। আবার কোন কোন লেখা দিয়ে সে ব্লাসফেমি আইন ও ভঙ্গ করেছে। কিন্তু আজ সে মানুষের আইন আর বিচারের বাইরে। তার বিচার আল্লাহতায়ালা করবেন।

অপরদিকে তাকে হত্যা করা হবে বলে যারা পোস্ট দিয়েছে তারাও হেইট স্পীচ এর অভিযোগে অভিযুক্ত। আমরা এখনো জানিনা অভিজিৎ এর খুনের পিছনে আসল কারন কি আর কে কে জড়িত। দুই তিনটা ফেসবুক পোস্ট-কমেন্ট আর রহস্যজনক টুইট এর ভিত্তিতে এত তাড়াতাড়ি বলা যাবে না এই ব্যাপারে কে আসল ক্রিমিনাল। এই মুহূর্তে আছে কিছু সাসপেক্ট।

কিন্তু যারা আদতেই এই খুনের প্ল্যান করেছে আর এই জঘন্য হত্যাকান্ডটি ঘটিয়েছে তারাই এক্ষেত্রে দন্ডনিয় অপরাধ করেছে ।

যেহেতু অভিজিৎ একজন মার্কিন নাগরিক এবং তার হত্যা মার্কিন সরকারের নজরে আছে তাই আশা করছি মার্কিন সরকারের চাপে অভিজিৎ এর প্রকৃত খুনিরা অচিরেই ধরা পড়বে এবং সঠিক বিচার সাপেক্ষে তাদের শাস্তি হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.