সরকারের গ্রেফতার-দমনাভিযান সত্ত্বেও চলমান আন্দোলন থেকে পিছু হটবে না বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোট। অনির্দিষ্টকালের ডাকা অবরোধ কর্মসূচিও চালিয়ে যাবে তারা। যথাশীঘ্রই নতুন নির্বাচনের দাবি মেনে না নেওয়া পর্যন্ত অবরোধের পাশাপাশি হরতাল কর্মসূচিও চলবে। হরতাল-অবরোধের মাধ্যমেই চলমান রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান খুঁজছেন ২০ দল। যদিও মাঠে নেই বিএনপি জোটের বড় নেতারা। মধ্যম সারির নেতারাও লাপাত্তা। আন্দোলনে বেগম জিয়ার ভরসা শুধুই তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকরা। তাদের ওপর আস্থা রেখেই গুলশান কার্যালয়ে প্রায় এক মাস ধরে অবস্থান নেওয়া বিএনপি প্রধান এখনো আন্দোলন প্রশ্নে সরকারকে ছাড় দিতে নারাজ। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নতি স্বীকার না করলে যতদিন প্রয়োজন ততদিনই কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন বলে ঘনিষ্ঠজনদের সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তিনি।
বেগম জিয়া বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে আলাপকালেও নিজের কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া বলেন, জুলুম-নির্যাতন চালিয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলন দমানো যাবে না। শত বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশে দেশব্যাপী সর্বাত্মক অবরোধ চালিয়ে যাবে দলের সর্বস্তরের নেতা-কর্মীরা। দাবি আদায়ে প্রয়োজনে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে। জানা গেছে, হামলা-মামলা, জেল-জুলুম মোকাবিলা করেই বিজয় অর্জন করে ঘরে ফিরতে চায় বিএনপি জোট। তবে অতীতের মতো এবার গতানুগতিক সংলাপে বসতেও অনাগ্রহী বিএনপি জোট। দ্রুত নির্বাচনের জন্য সুনির্দিষ্ট এজেন্ডায় আলোচনা হলেও কেবল তাতে সাড়া দেওয়া হবে। বিএনপি সমর্থিত বেশকিছু পেশাজীবী সংগঠনের নেতাদের মাধ্যমে বেগম জিয়া সব ধরনের জুলুম-নির্যাতন সহ্য করে দলীয় নেতা-কর্মীদের প্রতি আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
আবার গুলশান কার্যালয় থেকেই বিভিন্ন মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথাও বলছেন তিনি। আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের পরামর্শ নিয়ে বিভিন্ন দিকনির্দেশনাও দিচ্ছেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। সম্প্রতি দায়িত্বশীল কয়েকজন নেতার সঙ্গে বিভিন্ন মাধ্যমে আলাপকালে বেগম জিয়া বলেছেন, ‘আগামী ১০ দিন আপনারা গ্রেফতার এড়িয়ে আন্দোলন চালিয়ে যান, বাকি দায়িত্ব আমার।’ জানা গেছে, ঘনিষ্ঠজনদের বিএনপি চেয়ারপারসন বলেছেন, জীবনে বহু জুলুম-নির্যাতন আমি সহ্য করেছি।
এখনো করতে হচ্ছে। কথা দিচ্ছি- যত প্রতিকূল অবস্থাই থাকুক না কেন, কিছুতেই কার্যালয় ছেড়ে যাব না। ক্ষুধা, তৃষ্ণা, অন্ধকার, মামলা-হামলা যা কিছুই আসুক-সব জুলুম-নির্যাতন সহ্য করে আন্দোলনকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাব। মাঠের নেতা-কর্মীরা আমার সঙ্গে আছেন। বিজয় আমাদের হবেই ইনশাল্লাহ। গত শনিবার রাতে গুলশানের বিদ্যুৎবিহীন রাজনৈতিক কার্যালয়ে কয়েকজন বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবী নেতা দেখা করতে গেলে তাদের সঙ্গে আলাপকালেও নিজের অবস্থানের কথা তুলে ধরেন বেগম খালেদা জিয়া। এ সময় তিনি ঢাকার সিনিয়র নেতাদের ভূমিকায় কিছুটা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। রাজধানীতে আন্দোলনে গতি আনতে নানা কৌশল নিয়েও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেন বিএনপি প্রধান।
গুলশান কার্যালয়ে বিএনপি প্রধানের সঙ্গে দেখা করে এসে এক পেশাজীবী সংগঠনের নেতা বলেন, ‘যত কিছুই হোক, কার্যালয় ছাড়বেন না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন বেগম জিয়া। তিনি (বেগম জিয়া) জানিয়েছেন, তার হারানোর কিছুই নেই। তিনি দেশের মানুষের জন্য রাজনীতি ও আন্দোলন করছেন। দেশের মানুষ ও দলের অগণিত কর্মী-সমর্থক তার সঙ্গে আছেন। অন্ধকার, ক্ষুধা, তৃষ্ণা কোনোকিছুই ধমাতে পারবে না।’ সাক্ষাৎ করে আসা দুজন বুদ্ধিজীবী বলেন, ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় খালেদা জিয়া অবরোধ-হরতাল প্রত্যাহার করেননি। চলমান আন্দোলন কর্মসূচিতে কোনো হেরফের ঘটেনি। নিজের কার্যালয়ও ছেড়ে যাননি। ওয়ান-ইলেভেনের সময় তিনি কারাভোগ করেছেন, কিন্তু ভয় পাননি। কাজেই প্রতিকূল পরিবেশ-পরিস্থিতি সৃষ্টি করে তার অবস্থান পরিবর্তন করা যাবে না।
এদিকে প্রায় এক মাস ধরে চলা অনির্দিষ্টকালের অবরোধে মাঠে নেই বিএনপি জোটের প্রথম সারির নেতারা। বিশেষ করে ঢাকা মহানগরে অবস্থান নেওয়া কেন্দ্রীয় নেতারা আত্মগোপনে চলে গেছেন। মহানগর বিএনপির নতুন কমিটি গঠন হলেও আশানুরূপ ফলাফল না পাওয়ায় বেগম জিয়াও কিছুটা নাখোশ। যুবদল, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দলসহ অঙ্গসংগঠনের ভূমিকাতেও খুশি নন তিনি। দলের স্থায়ী কমিটির দু-একজন সদস্য ছাড়া কারোরই গ্রেফতার আতঙ্ক না থাকলেও তারা বেগম জিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করেন না। অবশ্য স্থায়ী কমিটির একাধিক নেতা বিভিন্ন মামলার আসামি থাকায় আন্দোলন থেকে নিজেদের আড়ালে রেখেছেন।
বেগম জিয়ার নির্দেশেই গ্রেফতার এড়াতে তারা এ কৌশল নিয়েছেন বলে জানা গেছে। একই কারণে ঢাকা মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব হাবিব-উন নবী খান সোহেল, এক নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুল আওয়াল মিন্টু, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদ, ডেমরার সাবেক সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ, সাবেক কাউন্সিলর এম এ কাইয়ুম, যুবদল সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম নীরব, যুবদল নেতা রফিকুল আলম মজনু, স্বেচ্ছাসেবক দল সাধারণ সম্পাদক মীর সরফত আলী সপু, সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল বারী বাবু, ছাত্রদল সভাপতি রাজিব আহসান, সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান, ছাত্রদল নেতা এনামুল হক এনাম ও ইসহাক সরকার আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
আতিক/প্রবাস

