ইসলামের মহানবী হজরত মুহম্মদ (সা.) যেসব সংস্কার ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন, সামাজিক অসাম্য দূরীকরণ ছিল তার মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী। নিছক জন্মগত বা বংশগত কারণে একের ওপর অপরের প্রাধান্য তিনি স্বীকার করতেন না। যুগ যুগ ধরে মানুষ কায়েমী স্বার্থের খাতিরে যেসব সামাজিক বৈষম্যের প্রাচীর গড়ে তুলেছিল রসুলে করীমের (সা.) প্রবর্তিত সাম্যের বিধান তার মূলোচ্ছেদ করল। তিনি ঘোষণা করলেন, ‘সব মানুষ সমান, মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সে ব্যক্তি, যিনি আল্লাহর প্রতি অনুগত এবং মানুষের সর্বাধিক কল্যাণকামী।’ তার শিক্ষা ও আদর্শের প্রভাবে অল্পকালের মধ্যে আরবে অসাম্য দূরীভূত হলো। তিনি দুনিয়ার বুকে বিশ্বমানবের এমন এক ভ্রাতৃত্ব কায়েম করলেন যেখানে উঁচু, নিচু, ধনী-নির্ধন, কালো-সাদার কোনো বৈষম্য রইল না।
সমাজজীবনে নারীকে উচ্চ মর্যাদাদান হজরত মুহম্মদের (সা.) আরেকটি উল্লেখযোগ্য সংস্কার। ইসলামের আবির্ভাবের আগে অপর কোনো ধর্ম নারীকে উপযুক্ত মর্যাদাদানের ব্যবস্থা করেনি। সামাজিক জীবনে নারীরা ছিল অবজ্ঞাত এবং তাদের ভোগের সামাগ্রী হিসেবেই শুধু গণ্য করা হতো। দুনিয়ার কোথাও তাদের পুরুষের জীবনসঙ্গিনী হিসেবে উপযুক্ত মর্যাদা দেওয়া হত না। অতীতের সভ্যতাগর্বিত গ্রিক সমাজের নারীরাও ছিল পুরুষের দাসী মাত্র। পরিবারের কর্তা ইচ্ছা করলে নারীকে বিক্রয় ও হস্তান্তর করতে পারত; পিতা ও স্বামীর সম্পত্তিতে শরিক হওয়ার অধিকার নারীদের ছিল না। ইসলাম নারীকে দিয়েছে অভূতপূর্ব মর্যাদা। নারীদের অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা প্রদানে হজরত মুহম্মদ (সা.) দৃঢ় ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। কোরআন শরীফে ঘোষণা করা হয়েছে : ‘পুরুষের নারীর ওপর ঠিক যতটা অধিকার রয়েছে, নারীরও পুরুষের ওপর ততটা অধিকার রয়েছে।’ আইনের দৃষ্টিতে পুরুষ ও নারীকে সমমর্যাদার অধিকার দেওয়া হয়েছে। সম্পত্তির উত্তরাধিকারসংক্রান্ত আইনের ক্ষেত্রে মুসলিম নারী অপর যে কোনো ধর্মের নারী অপেক্ষা অধিকতর সম্মানজনক মর্যাদার অধিকারণী। নারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন তার প্রচারিত জীবন দর্শনের এক অপরিহার্য অংশ ছিল। তিনি মাতার পদতলে সন্তানের বেহেশত নির্দেশ করেছেন এবং নারীকে তিনি স্বামীগৃহের সর্বময় কর্ত্রী বলে ঘোষণা করেছেন। তিনি আরও বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তি সর্বোত্তম যে তার স্ত্রীর প্রতি সর্বোত্তম ব্যবহার করে।’ নারীকে তিনি পূর্ণতম অধিকার দান করে শৃঙ্খলমুক্ত করেছেন, বিবাহের সময় তাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং মৃত পিতা ও স্বামীর সম্পত্তির উত্তরাধিকার ভোগের অধিকার দিয়েছেন। তিনি আরবে কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়ার প্রচলিত রীতি চিরতরে বন্ধ করেন। তার প্রবর্তিত আইন-কানুন নারীকে পুরুষের অত্যাচার, উৎপীড়ন ও অবিচার থেকে মুক্ত করে দিয়েছে।
হজরত নবী করিম (সা.) আরব জাতির মধ্যে বহু যুগের প্রচলিত দাসপ্রথার মূলে কুঠারাঘাত করেন। দাসপ্রথা গ্রিক, রোমান, ইহুদি ও খ্রিস্টানদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। মুনিবরা দাসদের জীবন-মরণের প্রভু ছিল বলে তাদের প্রতি তারা অমানুষিক আচরণ করত। খ্রিস্টানরা দাসপ্রথাকে স্বীকৃত রীতি হিসেবে গ্রহণ করেছিল এবং সমাজে তাদের কল্যাণের জন্য কোনো কিছু করার ব্যবস্থা ছিল না। দাস-দাসীদের মানুষের মর্যাদায় উন্নীত করার জন্য মহানবী (সা.) সর্ববিধ ব্যবস্থা অবলম্বন করেছিলেন। ‘দাস-দাসীদের মুক্তিদানের চেয়ে শ্রেষ্ঠতর কার্য আল্লাহর কাছে আর কিছুই নেই’- এ বাণী ঘোষণা করে তিনি তাদের মুক্তির পথ উন্মুক্ত করেছিলেন। তিনি বহু দাস-দাসীকে খরিদ করে তাদের আজাদ করেন এবং অনেককে উচ্চপদে সমাসীন করে তাদের সামাজিক মর্যাদাকে স্বীকৃতি দেন। তিনি তার অনুসারীদের দাসদের প্রতি সদয় ব্যবহার ও ন্যায়বিচার করার নির্দেশ দিতেন। বিশেষ কারণে দাসপ্রথার উচ্ছেদ সাধন তার পক্ষে সম্ভব না হলেও দাসদের প্রতি তার সহৃদয় আচরণবিধি এবং উচ্চপদে যোগ্য দাসদের নিয়োগ দাসপ্রথার ক্রমাবলুপ্তির পথ প্রশস্ত করেছিল।
প্রাক-ইসলামী আরববাসীর নৈতিক মান উন্নত করার জন্য হজরত রসুল করিম (সা.) মদ্যপান, জুয়াখেলা, পরদ্রব্য অপহরণ, রাহাজানি, নারী ধর্ষণ, নারীর বহু স্বামী গ্রহণ, পুরুষের সংখ্যাতীত স্ত্রী গ্রহণ ইত্যাদি কোরআনের অনুশাসন অনুযায়ী সম্পূর্ণ অবৈধ ঘোষণা করলেন। ফলে যুগ যুগ আচরিত পাপ ও অন্যায় আরব সমাজ থেকে দূরীভূত হলো। তিনি আরবদের সর্ববিধ কুসংস্কার হতে মুক্ত করেছিলেন। এভাবে তিনি আরবের সমাজব্যবস্থায় এনেছিলেন এক সুদূরপ্রসারী এবং যুগান্তকারী বিপ্লব।
গ্রন্থনা : শাকিলা জাহান

